মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
চিকিৎসা নিতে এসে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি! কমলগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওয়াশরুমে নোংরামির রাজত্ব
চিকিৎসা নিতে এসে রোগী ও স্বজনদের যদি হাসপাতালের শৌচাগারে প্রবেশ করতে গিয়ে নাক চেপে ধরতে হয়, তবে সেই স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কয়েকটি ওয়াশরুমের বর্তমান অবস্থা দেখে এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ মানুষের মনে। শৌচাগারগুলো যেন পরিচ্ছন্নতার সব মানদণ্ডকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পরিণত হয়েছে একেকটি ময়লার ভাগাড়ে। সম্প্রতি হাসপাতালের ভেতরের কয়েকটি শৌচাগারের চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। প্রকাশিত ছবিতে দেখা
যায়, মেঝেজুড়ে জমে আছে ময়লা-আবর্জনা, ব্যবহৃত টিস্যু, প্লাস্টিকের বোতল ও বিভিন্ন বর্জ্য। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে শৌচাগারের ভেতরে সৃষ্টি হয়েছে অসহনীয় দুর্গন্ধ। দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে জমেছে ময়লা ও ছত্রাক, যা দীর্ঘদিন ধরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবেরই প্রমাণ বহন করে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এটি কোনো সাময়িক সমস্যা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই হাসপাতালের শৌচাগারগুলোর এমন করুণ অবস্থা বিরাজ করছে। অথচ প্রতিদিন শত শত রোগী ও তাদের স্বজনরা এই হাসপাতালের সেবা নিতে আসেন। তাদের অনেকেই বাধ্য হয়ে এসব অস্বাস্থ্যকর শৌচাগার ব্যবহার করেন, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। একজন রোগীর স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “হাসপাতাল এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষ সুস্থ হওয়ার আশায় আসে। কিন্তু এখানকার ওয়াশরুমে ঢুকলে মনে হয় অসুস্থতা আরও বেড়ে যাবে। শৌচাগারের এই পরিবেশ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।” স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়; এটি রোগী নিরাপত্তা ও সংক্রমণ প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অপরিচ্ছন্ন শৌচাগার থেকে জীবাণু ছড়িয়ে রোগী, স্বজন এমনকি হাসপাতালের কর্মীরাও সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও দুর্বল রোগীদের জন্য এটি আরও উদ্বেগজনক। সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি সরকারি হাসপাতালের শৌচাগার যদি এমন নাজুক অবস্থায় থাকে, তবে তা শুধু ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের প্রতিও চরম অবহেলার পরিচায়ক। সরকারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যখাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও মাঠপর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রে তার সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, হাসপাতালের ওয়ার্ড, করিডোর কিংবা বহির্বিভাগের পাশাপাশি শৌচাগারগুলোর প্রতিও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ পরিচ্ছন্ন পরিবেশ একটি উন্নত স্বাস্থ্যসেবার অপরিহার্য অংশ। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ এবং কার্যকর তদারকি ছাড়া এ সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। সচেতন নাগরিকরা বলছেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি জেলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও এ বিষয়ে নজর দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে নিয়মিত মনিটরিং এবং আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে হাসপাতালের সার্বিক পরিবেশ মূল্যায়ন করা হলে এমন চিত্র অনেকাংশে পরিবর্তন করা সম্ভব। এ ঘটনায় মৌলভীবাজার জেলার সিভিল সার্জনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, শুধু কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নয়, জেলার প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত হাসপাতালগুলোতে ন্যূনতম স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। ‘নিরাপদ চিকিৎসা চাই, মৌলভীবাজার জেলা শাখা’-এর পক্ষ থেকেও হাসপাতালের এমন অব্যবস্থাপনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ বলেন, রোগীদের মৌলিক অধিকার হলো একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে চিকিৎসাসেবা পাওয়া। অথচ বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে সেই অধিকার উপেক্ষিত হচ্ছে। তারা অবিলম্বে হাসপাতালের শৌচাগারগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থাও চালুর আহ্বান জানিয়েছেন। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই হাসপাতালের পরিবেশ এমন হওয়া উচিত, যা রোগীদের সুস্থতার পথে সহায়ক হবে, নতুন দুর্ভোগের কারণ নয়। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শৌচাগারগুলোকে জনস্বাস্থ্যের উপযোগী পরিবেশে ফিরিয়ে আনতে কী উদ্যোগ নেয়। সংবাদ সারাংশ: কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শৌচাগারগুলোর অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশ নিয়ে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। পরিচ্ছন্নতার অভাব, দুর্গন্ধ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। জেলার সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

