মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
চেনা লেবেলের আড়ালে মৃত্যুফাঁদ
রোগ থেকে মুক্তি পেতে মানুষ যে জিনিসটির ওপর সবচেয়ে বেশি ভরসা করে, সেটি হলো ওষুধ। কিন্তু সেই ওষুধই যদি প্রতারণার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় বিপদের আর কী হতে পারে? দেশের বিভিন্ন গ্রামীণ অঞ্চলে সম্প্রতি উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে অনুমোদনহীন ও নিম্নমানের ওষুধের বিস্তার। সুপরিচিত ওষুধ কোম্পানির পণ্যের মোড়ক, রঙ, ডিজাইন ও লোগো প্রায় হুবহু নকল করে বাজারে ছাড়া হচ্ছে এসব ওষুধ। পার্থক্য শুধু নামের বানানে সামান্য হেরফের। প্রথম দেখায় সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল-নকলের পার্থক্য বোঝা
প্রায় অসম্ভব। আর সেই সুযোগই কাজে লাগাচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ী চক্র। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ওষুধের নামের বানান বা উপাদান না দেখে মূলত মোড়কের রঙ, লেবেল কিংবা পরিচিত ডিজাইন দেখে ওষুধ কেনেন। ফলে নকল ও অনুমোদনহীন ওষুধ সহজেই তাদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ফেরিওয়ালা কিংবা কথিত স্বাস্থ্যসেবাকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাত-ব্যথা, অ্যালার্জি, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগ স্থায়ীভাবে সারিয়ে তোলার প্রলোভন দেখিয়ে এসব ওষুধ বিক্রি করছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ওষুধের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এর উপাদান সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত আরাম দেওয়ার জন্য গোপনে স্টেরয়েড ব্যবহার করা হয়। এতে রোগী সাময়িক স্বস্তি পেলেও দীর্ঘমেয়াদে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাড় ক্ষয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং কিডনির জটিলতা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে কিছু ওষুধে অনিয়ন্ত্রিতভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের ফলে শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসাকেও কঠিন করে তুলতে পারে। এছাড়া অতিরিক্ত ব্যথানাশক উপাদান ব্যবহারের কারণে পাকস্থলীতে আলসার, লিভার ও কিডনির ক্ষতি, এমনকি হৃদরোগের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে। নিম্নমানের ও অজানা রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের কারণে হঠাৎ মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা প্রাণহানির ঘটনাও অস্বাভাবিক নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “দ্রুত রোগমুক্তি”, “শতভাগ গ্যারান্টি”, “স্থায়ী সমাধান” কিংবা “সব রোগের এক ওষুধ”—এ ধরনের বিজ্ঞাপন সাধারণত প্রতারণার অন্যতম লক্ষণ। বৈজ্ঞানিক চিকিৎসাব্যবস্থায় কোনো রোগের চিকিৎসা কখনোই অলৌকিক প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করে না। সচেতনতার মাধ্যমেই এই বিপদ থেকে অনেকাংশে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। ওষুধ কেনার সময় শুধু মোড়ক দেখে নয়, নামের বানান, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, মেয়াদ এবং সরকারি অনুমোদনের তথ্য যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে অবশ্যই লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও বিশ্বস্ত ফার্মেসি থেকে ওষুধ সংগ্রহ করতে হবে। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন না করাই নিরাপদ। বিশেষ করে ফেরিওয়ালা, অচেনা ব্যক্তি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চটকদার বিজ্ঞাপনের প্রলোভনে পড়ে ওষুধ কেনা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুমোদনহীন ওষুধ শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, এটি একটি নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। মনে রাখতে হবে, রোগের চেয়ে ভুল চিকিৎসা অনেক সময় বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। তাই চেনা মোড়কের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রতারণার ফাঁদ থেকে নিজেকে এবং পরিবারকে রক্ষা করতে সচেতন হোন। যাচাই-বাছাই করে ওষুধ কিনুন, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন এবং অনুমোদনহীন ও নামহীন ওষুধকে স্পষ্টভাবে ‘না’ বলুন।

