মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
শ্রীমঙ্গল শতবর্ষী বালিকা বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক শূন্যতা
শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার মেয়েদের জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—কিন্তু সেখানে নেই একজনও নারী শিক্ষক। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান বাস্তবতা যেন এক নীরব সংকটের প্রতিচ্ছবি। প্রায় একশ বছরের পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানটিতে দীর্ঘদিন ধরে নারী শিক্ষকের অভাব শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতাই নয়, বরং শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বস্তি ও স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৬০০ ছাত্রী এখানে পড়াশোনা করছে
। অথচ সহকারী শিক্ষক পদে পাঁচটি শূন্যতা রয়েছে, এবং সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়—একজন নারী শিক্ষকও নেই। ফলে পাঠদানে যেমন ব্যাঘাত ঘটছে, তেমনি কিশোরী শিক্ষার্থীরা তাদের ব্যক্তিগত ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে চরম সংকোচে ভুগছে। সংকোচ, নীরবতা আর অস্বস্তির শিক্ষা পরিবেশ কৈশোরে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সময় একজন নারী শিক্ষকের উপস্থিতি কতটা প্রয়োজন তা এখানে প্রতিদিন অনুভব করছে ছাত্রীদের বড় একটি অংশ। অনেকেই জানান, হঠাৎ অসুস্থতা, মাসিকজনিত সমস্যা কিংবা ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নিয়ে পুরুষ শিক্ষকের কাছে যাওয়া তাদের জন্য বিব্রতকর হয়ে ওঠে। ফলে প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকেও বঞ্চিত হতে হয়। শুধু শ্রেণিকক্ষ নয়, সহশিক্ষা কার্যক্রমেও এই অভাব প্রকট। বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা বাইরের প্রোগ্রামে অংশ নিতে গিয়ে নারী শিক্ষকের অনুপস্থিতি শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অভিভাবকদের উদ্বেগ: ‘কমপক্ষে একজন হলেও প্রয়োজন’ অভিভাবকরাও বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। তাদের মতে, একটি বালিকা বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক না থাকা কেবল অব্যবস্থাপনার নয়, বরং একটি বড় ধরনের অবহেলার উদাহরণ। মেয়েদের হঠাৎ শারীরিক সমস্যা হলে তারা পুরুষ শিক্ষকদের কাছে তা প্রকাশ করতে পারে না—এটা স্বাভাবিক। তাই অন্তত একজন বা দুজন নারী শিক্ষক থাকলে শিক্ষার্থীরা সহজেই তাদের সমস্যার সমাধান পেত। প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতা বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। স্থায়ী নেতৃত্বের অভাব প্রশাসনিক কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলছে। জানা গেছে, নারী শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত আবেদন করা হলেও বাস্তবে কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। এমনকি বিভাগীয় পর্যায়ের সভায় নারী শিক্ষক পদায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও তা বাস্তবায়ন হয়নি—যা প্রশ্ন তুলেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকারিতা নিয়ে। সচেতন মহলের মত: ‘এটি কেবল শিক্ষক সংকট নয়’ শিক্ষাবিদদের মতে, এটি শুধু জনবল সংকটের বিষয় নয়; বরং একটি বালিকা বিদ্যালয়ের মৌলিক চাহিদার ঘাটতি। একজন নারী শিক্ষক কেবল পাঠদান করেন না—তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য হয়ে ওঠেন একজন অভিভাবক, পরামর্শদাতা এবং মানসিক আশ্রয়স্থল। আশ্বাস আছে, বাস্তবতা অনিশ্চিত স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিলেও বাস্তব চিত্র এখনো অপরিবর্তিত। নতুন নিয়োগ বা ডেপুটেশনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের কথা বলা হচ্ছে, তবে কবে নাগাদ তা কার্যকর হবে—সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। শেষকথা: সময় এখন সিদ্ধান্তের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক না থাকা কেবল একটি শূন্য পদ নয়—এটি একটি প্রজন্মের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা। দীর্ঘদিনের এই অবহেলা আর বিলম্ব যদি দ্রুত দূর না করা হয়, তবে এর প্রভাব পড়বে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস, মানসিক স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতের ওপর। এখন দেখার বিষয়—দায়িত্বশীল মহল কত দ্রুত এই নীরব সংকটের বাস্তব সমাধান এনে দিতে পারে।

