মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
মৌলভীবাজারে চিকিৎসাসেবার নামে কসাইখানা দেখার কি কেউ নেই?
মৌলভীবাজারে চিকিৎসাসেবা নিয়ে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ যেন নতুন করে বিস্ফোরিত হয়েছে একটি ফি-সংক্রান্ত নোটিশকে কেন্দ্র করে। চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও বাস্তবতায় সেই সেবা এখন অনেকের কাছে নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে বেসরকারি চেম্বারভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় রোগীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি শহরের নুরুন নাহার ফার্মেসিতে বসা অধ্যাপক ডাঃ কাজী মহিবুর রহমানের চেম্বারের একটি নোটিশ সামাজিক যো
গাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। নোটিশ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে তাঁর চেম্বারে প্রথম ভিজিটের ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ১,৫০০ টাকা এবং এক মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বার দেখাতে গেলে দিতে হবে ১,৪০০ টাকা। এই ফি কাঠামো নিয়েই শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। সাধারণত একজন রোগী প্রথমবার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুনরায় দেখালে ফলো-আপ ফি তুলনামূলক কম হয়ে থাকে। কিন্তু এখানে প্রথম ও দ্বিতীয় ভিজিটের ফি-এর মধ্যে ব্যবধান মাত্র ১০০ টাকা হওয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এটি আদৌ রোগীবান্ধব সিদ্ধান্ত কি না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ওই নোটিশের নিচে শত শত মন্তব্য জমা পড়েছে। অধিকাংশ মন্তব্যেই ক্ষোভ, হতাশা এবং উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা গেছে। কেউ কেউ বলছেন, চিকিৎসাসেবা ধীরে ধীরে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে। একজন স্থানীয় যুবক মন্তব্য করেছেন, “মৌলভীবাজারের মতো জেলা শহরে ১,৫০০ টাকা ভিজিট ফি অনেক পরিবারের জন্য বড় চাপ। অসুস্থ হলে মানুষ চিকিৎসা নেবে, নাকি সংসার চালাবে—এটাই এখন প্রশ্ন।” একজন গৃহিণী লিখেছেন, “ডাক্তারের ফি দিতেই যদি কষ্ট হয়, তাহলে ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অন্যান্য চিকিৎসা ব্যয় বহন করবে কীভাবে সাধারণ মানুষ?” এ ধরনের প্রতিক্রিয়া কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গেও কথা বললে একই ধরনের উদ্বেগের কথা উঠে আসে। অনেকের মতে, সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ অত্যধিক হওয়ায় বাধ্য হয়ে মানুষ বেসরকারি চেম্বারে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে যদি অতিরিক্ত ফি দিতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের সামনে কার্যত আর কোনো বিকল্প থাকে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি চাকরিজীবী বলেন, “মাসের বাজেট মেলানোই কঠিন হয়ে পড়ে। পরিবারের একজন সদস্য অসুস্থ হলে চিকিৎসা ব্যয় বহন করা এখন বড় ধরনের আর্থিক সংকটে ফেলে দেয়। চিকিৎসাসেবা যেন ধীরে ধীরে ব্যবসায়িক পণ্যে পরিণত হচ্ছে।” তবে বিষয়টির আরেকটি দিকও রয়েছে। চিকিৎসকরা দীর্ঘ শিক্ষাজীবন, প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা এবং ক্রমবর্ধমান পরিচালন ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে চেম্বার পরিচালনা, জনবল, যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য খরচও চিকিৎসা ফি নির্ধারণে প্রভাব ফেলে। কিন্তু জনসাধারণের প্রশ্ন হলো—এই ব্যয়ের ভার কতটা রোগীর ওপর চাপানো যৌক্তিক এবং এর কোনো গ্রহণযোগ্য সীমা থাকা উচিত কি না। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, চিকিৎসকদের ফি নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও যৌক্তিকতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে রোগীদের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। কারণ চিকিৎসা এমন একটি সেবা, যা মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এটি কেবল বাজার অর্থনীতির সাধারণ পণ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। সচেতন নাগরিকদের দাবি, স্বাস্থ্যসেবার মান বজায় রেখেই রোগীবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। বেসরকারি চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে একটি যৌক্তিক ফি কাঠামো নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালগুলোর সেবার মান ও সক্ষমতা বাড়ানো গেলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ অনেকটাই কমবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান বিতর্কের পর এখন জনমনে একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে—চিকিৎসাসেবা কি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে? যদি তাই হয়, তবে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। কারণ অসুস্থ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মানবিক ও সহজলভ্য চিকিৎসা; আর সেই অধিকার যেন কোনোভাবেই অর্থের কাছে জিম্মি না হয়ে পড়ে। এই সংস্করণটি পত্রিকার উপ-সম্পাদকীয়/কলামধর্মী প্রতিবেদন হিসেবে উপযোগী, যেখানে অভিযোগ, জনমত ও নীতিগত প্রশ্নগুলো তুলে ধরা হয়েছে, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অপ্রমাণিত অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।

