মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে শেরপুর পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই শফিকুল ইসলাম পুলিশ লাইনে ক্লোজ
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার শেরপুর পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) শফিকুল ইসলাম শফিককে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত (ক্লোজ) করা হয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং কথিতভাবে মাদকের আস্তানা থেকে নিয়মিত আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ ওঠার পর জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশে এ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। গত ৩১ জুলাই ২০২৬ তারিখে জারি করা স্মারক নং-২১৭৮/আরও-এর আলোকে আদেশটি কার্যকর হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। শেরপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই ওবায়দুল হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান,
জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশনা অনুযায়ী এএসআই শফিকুল ইসলামকে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও পরবর্তী সিদ্ধান্ত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার সরকার বাজার এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, একাধিকবার প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ জানানো হলেও কার্যকর অভিযান বা স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অভিযুক্তরা বারবার ফিরে এসে একই কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, এলাকায় গাঁজা, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের অবাধ বেচাকেনা চললেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় মাদক ব্যবসা আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ পায়। অনেকের ভাষ্য, অসাধু প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া ও কথিতভাবে কিছু ব্যক্তির সহযোগিতায় এ অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চলছিল। পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায় গত ৩১ জুলাই। ওই দিন সরকার বাজার এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা মজনু মিয়াসহ কয়েকজনকে কথিত মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে আটক করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, তাদের কাছ থেকে গাঁজা ও ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে মৌলভীবাজার সদর থানার একটি টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে আটক ব্যক্তিদের নিজেদের হেফাজতে নেয় এবং আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে থানায় নিয়ে যায়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, শেরপুর পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই শফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে অভিযুক্ত মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করতেন। তাদের দাবি, এসব অভিযোগের কারণেই জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি আমলে নিয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তবে অভিযোগের বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন এএসআই শফিকুল ইসলাম। তিনি মুঠোফোনে বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তার দাবি, অতীতে লন্ডনপ্রবাসী সোহাগের এক ভাইকে একটি মামলায় আটক করার জের ধরে ক্ষুব্ধ একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তিনি বলেন, “আমি কখনো কোনো মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করিনি। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ সাজানো। নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে এবং অভিযোগকারীদের উদ্দেশ্যও স্পষ্ট হবে।” জেলা পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং তদন্তের স্বার্থেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিভাগীয় বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অন্যদিকে অভিযোগ অসত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাও ন্যায়বিচার পাবেন। এলাকাবাসীর মতে, মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নাতীত হওয়া জরুরি। তাই কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে যদি অনিয়ম, দুর্নীতি বা অপরাধীদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ ওঠে, তবে সেটির নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া সময়ের দাবি। একই সঙ্গে প্রকৃত অপরাধী যেই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদেরও অভিমত, মাদকের ভয়াবহ বিস্তার রোধে শুধু ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করলেই হবে না; তাদের সহযোগী বা আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভ্যন্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে মাদক নির্মূলে চলমান অভিযান আরও কার্যকর হবে। সরকার বাজারসহ আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিতকরণ এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, এ ঘটনার মাধ্যমে একটি স্পষ্ট বার্তা যাবে—আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয় এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

