মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
আড়াই কোটির ‘চুক্তি বিতর্কে তোলপাড়
দেশের পুলিশ প্রশাসনে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে মৌলভীবাজারের নবনিযুক্ত পুলিশ সুপার (এসপি) মো. রিয়াজুল ইসলামকে হঠাৎ প্রত্যাহারের ঘটনা। দায়িত্ব গ্রহণের এক সপ্তাহও পূর্ণ হওয়ার আগেই তাকে সদর দপ্তরে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নানা প্রশ্ন ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে প্রশাসনিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মাঝেও। শুক্রবার (১৫ মে) পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। আদেশে উল্লেখ করা হয়, মৌলভীবাজারে
র পুলিশ সুপার মো. রিয়াজুল ইসলাম জেলা পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে দায়িত্বভার বুঝিয়ে দিয়ে আগামী ১৬ মে’র মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে রিপোর্ট করবেন। তবে আদেশে প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ না থাকায় বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের গুঞ্জন আরও জোরালো হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অভিযোগকে কেন্দ্র করে এ ঘটনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, “আড়াই কোটি টাকার চুক্তির মাধ্যমে মৌলভীবাজারের এসপি পদে বদলি হয়েছিলেন রিয়াজুল ইসলাম।” যদিও অভিযোগটির কোনো আনুষ্ঠানিক সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি, তারপরও বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অনেকে প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ কেউ বলছেন, যদি অভিযোগটি ভিত্তিহীন হয়ে থাকে তাহলে দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। আবার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে কারণ এর আগে একই ধরনের পরিস্থিতিতে ফেনী ও পঞ্চগড় জেলার নবনিযুক্ত দুই পুলিশ সুপারকেও প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফেনীর পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া মোহাম্মদ মাহবুব আলম খান এবং পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমানকে গত ৯ মে পৃথক আদেশে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তর। সেই আদেশেও প্রত্যাহারের কারণ স্পষ্ট করা হয়নি। ফেনীর ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) উপ-কমিশনার মাহবুব আলম খানকে ১০ মে’র মধ্যে সদর দপ্তরে রিপোর্ট করতে বলা হয়। অন্যদিকে পঞ্চগড়ের এসপি মো. মিজানুর রহমানকে দায়িত্ব হস্তান্তর করে ১৬ মে’র মধ্যে সদর দপ্তরে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, গত ৫ মে দেশের ১২ জেলার পুলিশ সুপার পদে বড় ধরনের রদবদল আনা হয়েছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটিকে নিয়মিত বদলির অংশ বলা হলেও মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে তিন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করায় নতুন করে নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রশাসনিক মহলে আলোচনা চলছে এই বদলিগুলোর পেছনে কি শুধুই প্রশাসনিক প্রয়োজন ছিল, নাকি অন্য কোনো অদৃশ্য প্রভাব কাজ করেছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ পুলিশ প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা রাষ্ট্রের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এ ধরনের বিতর্ক যদি দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে সমাধান না করা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি ও অনাস্থা আরও বাড়তে পারে। মৌলভীবাজারবাসীর অনেকেই মনে করছেন, জেলার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুলিশ প্রশাসনের নেতৃত্ব নিয়ে এমন বিতর্ক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বিষয়টি নিয়ে দ্রুত তদন্ত ও পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। বর্তমানে প্রশাসনিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এই প্রত্যাহার কি শুধুই অভিযোগের চাপ সামলানোর কৌশল, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো বাস্তবতা? সময়ই হয়তো সেই উত্তর দেবে।

