মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
নিকাহ রেজিস্ট্রার মোঃ জুনাইদ আহমদের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ: বাল্যবিবাহসহ বহুমাত্রিক অভিযোগে প্রশাসনিক তৎপরতা
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায় নিকাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে জেলা রেজিস্ট্রারের তদন্তে। বাল্যবিবাহ নিবন্ধন থেকে শুরু করে রেজিস্ট্রেশন বইয়ে অসংগতি—একাধিক অনিয়মের বিষয় সামনে আসায় বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং প্রশাসনিক পর্যায়ে নড়াচড়া শুরু হয়েছে। জানা গেছে, কুলাউড়া উপজেলার ১৩ নম্বর কর্মধা ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্ট্রার মোঃ জুনাইদ আহমদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো সাম্প্রতিক এক পরিদর্শন ও যাচাই-বাছাইয়ে উঠে
আসে। গত ২৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মৌলভীবাজার জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে জারি করা এক পত্রে জেলা রেজিস্ট্রার মফিজুল ইসলামের স্বাক্ষরে এসব অনিয়মের বিষয় আনুষ্ঠানিকভাবে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগের তালিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিষয়গুলো শুধু প্রশাসনিক ত্রুটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কিছু ক্ষেত্রে তা আইনগত দৃষ্টিতেও গুরুতর। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো—অপ্রাপ্তবয়স্ক কনের বিবাহ নিবন্ধনের অভিযোগ, যা দেশের প্রচলিত আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকারের কঠোর অবস্থানের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের অনিয়ম শুধু দায়িত্বহীনতাই নয়, বরং সামাজিক অপরাধ হিসেবেও বিবেচিত। এছাড়া তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, তালিকাভুক্ত নিবন্ধন বইয়ের সঙ্গে বাস্তব বইয়ের মিল পাওয়া যায়নি। একাধিক নিবন্ধন বই ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা প্রশাসনিক নিয়মের পরিপন্থী। অনেক ক্ষেত্রে নিবন্ধন বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশে কনের স্বাক্ষর অনুপস্থিত, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় অন্যান্য স্বাক্ষরও পাওয়া যায়নি। তথ্য সংরক্ষণে অসামঞ্জস্যতা এবং বিবাহের তারিখ ও নিবন্ধনের তারিখের মধ্যে গরমিল—এসব বিষয় পুরো কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এ ধরনের অনিয়ম কেবল একটি ব্যক্তির দায়িত্বে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি পুরো নিবন্ধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর আঘাত হানে। একটি বিয়ে শুধু সামাজিক বন্ধন নয়—আইনগতভাবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি, যার যথাযথ নথিভুক্তি ভবিষ্যতে নানা আইনি ও পারিবারিক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেখানে যদি এই নথিভুক্তির মধ্যেই অনিয়ম থাকে, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। সূত্র জানিয়েছে, জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয় থেকে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। তদন্তের পরবর্তী ধাপে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয়—মাঠপর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ওপর নিয়মিত তদারকি কতটা জরুরি। আইন থাকলেই যথেষ্ট নয়, তার সঠিক প্রয়োগ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ। সারমর্মে বলা যায়, কুলাউড়ার এই ঘটনা শুধু একটি নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয় নয়; বরং এটি আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। যথাযথ তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমেই এ ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধ করা সম্ভব।

