মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
মৌলভীবাজার বিএনপিতে অনাস্থার ঝড়, সদস্য সচিব রিপনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
আ.লীগ নেতাদের প্রশ্রয়, মামলা বাণিজ্য ও নির্বাচনে জামাত প্রার্থীর কাছ থেকে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। দলটির সদস্য সচিব আব্দুর রহিম রিপনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া, চাঁদাবাজি, মামলা বাণিজ্য, সরকারি জায়গা দখলসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ তুলে কেন্দ্রে লিখিত অভিযোগ করেছেন আহ্বায়ক কমিটির অধিকাংশ সদস্য। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলা বিএনপির ৩২ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির মধ্যে ২৬ জন সদস্য ওই অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর করেছেন।
শনিবার কেন্দ্রীয় দপ্তরে পাঠানো ওই অভিযোগে রিপনের কর্মকাণ্ড তদন্ত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর মো. ফয়জুল করিম ময়ূনকে আহ্বায়ক করে ৩২ সদস্যের জেলা আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিতে শুরুতে সদস্য সচিবের কোনো পদ রাখা হয়নি। পরে দলীয় অচলাবস্থা দূর করতে মৌলভীবাজার-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি নাসের রহমানের অনুরোধে একজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে সদস্য সচিব হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে সেই উদ্যোগ উপেক্ষা করে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর আব্দুর রহিম রিপনকে সদস্য সচিব হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। কেন্দ্রের এ সিদ্ধান্তে জেলার অনেক নেতাকর্মী বিস্মিত হন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, রিপন দলীয় নিয়মনীতি উপেক্ষা করে প্রভাব খাটিয়ে এ পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। এরপর থেকে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নানা বিতর্ক ও বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারী নেতাদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রিপন ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। তার ছোট ভাই একজন সদস্য ঢাকার দক্ষিণখান এলাকার ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং একটি হত্যা মামলার আসামি বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, তিনি এখনো আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। জেলার মিনিবাস টার্মিনাল দখল, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের সঙ্গেও তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়, তার ছোট ভাইয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে বহু মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। এতে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক অনেক মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষকে আসামি করে একাধিক মামলায় আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের কিছু জেলা পর্যায়ের নেতাকে পলায়নের সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, নির্বাচনে দায়িত্বে থাকলেও রিপন কার্যকর ভূমিকা পালন করেননি। বরং নির্বাচনে জামাত প্রার্থীর কাছ থেকে আর্থিক লেন দেন করেছেন এবং সেই সমঝোতার মাধ্যমে বিএনপি প্রার্থীকে পরাজিত করতে ভূমিকা রেখেছেন বলেও অভিযোগে বলা হয়েছে। জেলা বিএনপির একাধিক নেতা জানান, রিপনের নেতৃত্বে দলীয় অভ্যন্তরে বিভাজন তৈরি হয়েছে। জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ এবং নেতাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করায় সাংগঠনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এসব পরিস্থিতিতে আহ্বায়ক কমিটির সদস্যরা জেলা আহ্বায়কের কাছে একটি সভা আহ্বানের লিখিত আবেদন করেন এবং সদস্য সচিবের প্রতি অনাস্থা জানান। পাশাপাশি রিপনকে অনুপস্থিত রেখে সভা করারও অনুরোধ জানান তারা। তবে পরে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ময়ূন ও সদস্য সচিব রিপনের স্বাক্ষরে ২৬ ফেব্রুয়ারি একটি সভা আহ্বানের বিজ্ঞপ্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। পরে ২৭ ফেব্রুয়ারি অনিবার্য কারণ দেখিয়ে ওই সভা স্থগিত করা হয়। অভিযোগপত্রে স্বাক্ষরকারী আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোশাররফ হোসেন বাদশা বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী পর্যালোচনা সভায় সর্বসম্মতিক্রমে রিপনের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে ওই সভায় জেলা আহ্বায়ক উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি উপস্থিত ছিলেন না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুর রহিম রিপন বলেন, তিনি বর্তমানে সৌদি আরবে ওমরাহ পালনে রয়েছেন। দেশে ফিরে এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলবেন বলে জানান। অন্যদিকে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফয়জুল করিম ময়ূনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পাঠানো খুদে বার্তারও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। বিএনপির সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জিকে গউছ বলেন, অভিযোগটি হয়তো মহাসচিবের দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে বিষয়টি এখনো তার হাতে পৌঁছায়নি বলে তিনি জানিয়েছেন।

