মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
কাজী ফার্মসের দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ জনপদ
মৌলভীবাজারে অবস্থিত কাজী ফার্মসের তীব্র দুর্গন্ধ ও বর্জ্য দূষণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন আশপাশের কয়েকটি গ্রামের হাজারো মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এ ভোগান্তির বিরুদ্ধে এবার রাস্তায় নেমেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরিবেশ দূষণ ও জনদুর্ভোগের প্রতিবাদে আয়োজিত মানববন্ধনে এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজী ফার্মসের কারখানা থেকে নির্গত তীব্র দুর্গন্ধে পুরো এলাকা প্রায় বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে
গভীর রাত পর্যন্ত দুর্গন্ধ আরও প্রকট আকার ধারণ করে। এতে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। অনেকেই শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাবসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন বলে জানান। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কয়েকজন ভুক্তভোগী বলেন, “আমরা বছরের পর বছর এই কষ্ট সহ্য করছি। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রেখেও দুর্গন্ধ থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না। আমাদের সন্তানরা ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না। অসুস্থ মানুষের অবস্থা আরও ভয়াবহ।” তারা আরও অভিযোগ করেন, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দেওয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং প্রতিবারই আশ্বাস মিললেও বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, কর্মসংস্থান হবে—এটা সবাই চায়। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের কারণে যদি সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো উন্নয়ন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তারা। এদিকে মানববন্ধন কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর ঘটনাস্থলে নতুন আলোচনা তৈরি হয়। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মৌলভীবাজার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ও তার সঙ্গীয় ফোর্সকে কাজী ফার্মসের ভেতরে প্রবেশ করতে দেখা যায়। এসময় তারা কারখানার অভ্যন্তরে অবস্থান করে প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথোপকথনে ব্যস্ত ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সাংবাদিকরা কারখানার ভেতরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে এগিয়ে গেলে দায়িত্বরত সিকিউরিটি সদস্যরা দ্রুত মূল গেইট বন্ধ করে দেন। বিষয়টি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। একজন স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম প্রশাসন আমাদের সমস্যার কথা শুনতে এসেছে। কিন্তু পরে যা দেখলাম, তাতে মনে হয়েছে সাধারণ মানুষের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।” সচেতন মহল মনে করছে, এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনের উচিত নিরপেক্ষ অবস্থান নিশ্চিত করা এবং জনগণের অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা। বিশেষ করে পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্যের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনো ধরনের গাফিলতি ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। পরিবেশবিদদের মতে, শিল্প কারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত মানদণ্ড যথাযথভাবে অনুসরণ করা না হলে আশপাশের জনপদে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। তাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য করা এবং নিয়মিত মনিটরিং করা জরুরি। এদিকে এলাকাবাসী হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে তারা আরও বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। তাদের দাবি, শুধু আশ্বাস নয়—বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চান তারা। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও দৃশ্যমান উদ্যোগ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

