মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
মৌলভীবাজারে এসপি বিল্লাল হোসেনকে ঘিরে বিতর্ক: অভিযোগের জালে প্রশাসন
মৌলভীবাজারে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) বিল্লাল হোসেনকে ঘিরে একের পর এক বিতর্ক সামনে আসছে। সরকারি সম্পত্তির ব্যবহার, অভ্যন্তরীণ কল্যাণমূলক ব্যবস্থাপনা এবং জনসেবামুখী উদ্যোগ বন্ধের মতো একাধিক বিষয়ে ওঠা অভিযোগ এখন শুধু জনমনে নয়, পুলিশের ভেতরেও তৈরি করেছে চাপা অসন্তোষ। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন কিছু তথ্য, যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি ঘিরে রয়েছে শহরের সাইফুর রহমান সড়কের পুরাতন সদর থানার জমি। অভিযোগ অনুযায়ী, এই সরক
ারি জমিতে কোনো লিখিত অনুমোদন ছাড়াই একটি একতলা টিনশেড মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে, যার তত্ত্বাবধানে ছিলেন স্বয়ং এসপি। প্রায় ১৩৫০ বর্গফুট জায়গাজুড়ে নির্মিত এই মার্কেটে রয়েছে ৯টি কক্ষ। এর মধ্যে ৭টি ইতোমধ্যে ভাড়া দেওয়া হয়েছে এবং বাকি দুটি রাখা হয়েছে ‘পুনাক’-এর জন্য। মার্কেটের এক ভাড়াটে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তিনি পাঁচ বছরের চুক্তিতে ৩ লাখ টাকা অগ্রিম এবং মাসিক ৭ হাজার টাকা ভাড়ায় একটি কক্ষ নিয়েছেন। প্রশ্ন উঠছে—পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের লিখিত অনুমতি ছাড়া সরকারি জমিতে এ ধরনের বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ কতটা বৈধ? সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় এমন কোনো ছাড়ের কথা উল্লেখ নেই, যা মৌখিক অনুমতিতে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণকে বৈধতা দেয়। অন্যদিকে, পুলিশ লাইন্সের কল্যাণমূলক একটি উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যাওয়াও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। পূর্ববর্তী এসপির সময় সাতটি গরু লালন-পালনের মাধ্যমে পুলিশ সদস্যদের জন্য স্বল্পমূল্যে দুধ সরবরাহ করা হতো। এতে সদস্যরা মাত্র ৪০ টাকা লিটার দরে দুধ পেতেন। কিন্তু বর্তমান এসপি দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি গরু মারা গেলে বাকিগুলো বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্তে তারা হতাশ। কারণ এতে তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কল্যাণ সুবিধা বন্ধ হয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ কথা বলতে না চাইলেও ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানা গেছে। এছাড়া জনসেবামুখী উদ্যোগ ‘আপনার এসপি’ বন্ধ হয়ে যাওয়াও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়েছে। এই ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে জেলার মানুষ সরাসরি ভিডিও কলে এসপির সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্যার কথা জানাতে পারতেন। এটি ছিল প্রশাসনকে জনগণের কাছে আরও সহজলভ্য করার একটি কার্যকর উদ্যোগ। কিন্তু বর্তমান এসপির সময়ে সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জনমনে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে এসপি বিল্লাল হোসেন বলেন, বড় স্থাপনা নির্মাণে অনুমতির প্রয়োজন হলেও সংশ্লিষ্ট মার্কেট নির্মাণে তিনি মৌখিক অনুমতি নিয়েছেন এবং এটি পুলিশের কল্যাণের জন্যই করা হয়েছে। পুলিশ লাইন্সে গরু বিক্রির বিষয়ে তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী সেখানে গরু রাখার সুযোগ না থাকায় সেগুলো বিক্রি করা হয়েছে। তবে তার এই বক্তব্যে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কারণ মৌখিক অনুমতির বিষয়টি তিনি কোনো নির্দিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে নিয়েছেন—এমন তথ্য দিতে পারেননি। অন্যদিকে, সিলেট রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাছির উদ্দিন আহমেদ এবং পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেভিনিউ শাখার অ্যাডিশনাল ডিআইজি মো. আজিজুল ইসলাম উভয়েই জানিয়েছেন, এ ধরনের কোনো মার্কেট নির্মাণের অনুমতির বিষয়ে তারা অবগত নন। প্রশাসনের ভেতর থেকে আসা এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিষয়টি বর্তমানে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। উল্লেখযোগ্য যে, গত ২৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে মৌলভীবাজারে যোগদানের পর থেকেই এসপি বিল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠতে শুরু করে। তবে এসব অভিযোগের সুরাহা না হওয়ায় জনমনে প্রশ্ন জাগছে—এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে প্রকৃত সত্য কী? সুশাসন ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে এ ধরনের অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে তদন্ত হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল। সরকারি সম্পদের ব্যবহারে স্বচ্ছতা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা না গেলে প্রশাসনের প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। মৌলভীবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু একটি জেলার নয়, বরং গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

