মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
প্রধানমন্ত্রীর সফরে নতুন আশার আলো: মৌলভীবাজারের তিন স্বপ্ন কি এবার বাস্তবের পথে?
প্রধানমন্ত্রীর সফরে জেগেছে মৌলভীবাজারের তিন স্বপ্ন মেডিকেল কলেজ, শমশেরনগর বিমানবন্দর ও বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ বাস্তবায়নের আশ্বাস মঞ্চ পরিদর্শনে এমপি নাসের রহমান, সন্ধ্যায় বিএনপির যৌথ প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত। আগামী ১৭ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মৌলভীবাজার সফরকে ঘিরে জেলার সর্বস্তরে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ। ফ্যামেলি কার্ড পাইলটিং কর্মসূচির তৃতীয় পর্যায়ের উদ্বোধন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর এ সফরকে কেন্দ্র করে যেমন প্রশাসনিক প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে, তেমনি নতুন করে আলোচনায় এসেছে জেলার দীর্ঘদিনে
র তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি—মৌলভীবাজারে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা, শমশেরনগর বিমানবন্দর চালু এবং মৌলভীবাজার সরকারি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উন্নীতকরণ। সোমবার (১৫ জুন) বিকেলে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানস্থলের মঞ্চ নির্মাণকাজ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন মৌলভীবাজার-৩ (সদর-রাজনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এম নাসের রহমান। তিনি বলেন, এটা তো অত্যন্ত আনন্দের বিষয় যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের মৌলভীবাজার জেলায় বিএনপি ক্ষমতায় আসার চার মাসের পরে আসছেন। এটা অত্যন্ত অভূতপূর্ব এবং প্রত্যাশারও বাইরে। আমরা তো ভাবতেই পারিনি এত দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর সফর হবে। তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি চলছে। নাসের রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে তিনি যেসব উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেগুলোর বাস্তবায়ন আগামী অর্থবছর থেকেই শুরু হবে বলে তিনি আশাবাদী। আপনারা জানেন, নির্বাচনের আগে আমি বেশ কয়েকটি প্রতিশ্রুতির কথা বলেছিলাম। সেগুলোর বাস্তবায়ন যাতে আগামী অর্থবছর থেকেই শুরু হয়, সেই লক্ষ্যেই কাজ চলছে। বিএনপি সরকারের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম আগামী ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া নতুন অর্থবছরে আরও গতি পাবে। জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, মৌলভীবাজারে মেডিকেল কলেজ স্থাপন, শমশেরনগর বিমানবন্দর চালু এবং মৌলভীবাজার সরকারি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রূপান্তর এই তিনটি দাবি বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। শমশেরনগর বিমানবন্দর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আপনারা জেনে খুশি হবেন, আমার দাবির প্রেক্ষিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে আগামী ২০ জুন পরিদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। তারা মৌলভীবাজারে আসছেন। শমশেরনগর বিমানবন্দর সরেজমিনে দেখবেন। এটার কার্যক্রম অলরেডি শুরু হয়ে গেছে। মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে নাসের রহমান বলেন, আমি পুরো ডিজাইন ও পরিকল্পনা নিয়ে মাননীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর কাছে গেছি। একটি টিম প্রাথমিকভাবে দেখে গেছে। আরও টিম আসবে। মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালের ভেতরেই আমরা মেডিকেল কলেজ করতে পারবো। এতে কোনো সমস্যা হবে না বলে আমি মনে করি। তিনি আরও জানান, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উন্নীত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা জমা দেওয়া হয়েছে। কলেজের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নতুন একাডেমিক ভবন, ছাত্রাবাস নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় সব পরিকল্পনা মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর কাছে দেওয়া হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুনজর রয়েছে। ইনশাআল্লাহ আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে। জেলার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। মৌলভীবাজার জেলার রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। ধাপে ধাপে জেলার সব গুরুত্বপূর্ণ সড়কের উন্নয়ন হবে। এছাড়াও জেলার স্বার্থসংশ্লিষ্ট আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হবে। প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে নির্মাণাধীন মঞ্চ পরিদর্শনের সময় এমপি নাসের রহমানের সঙ্গে ছিলেন যুবদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এবং মৌলভীবাজার যুবদলের সভাপতি জাকির হোসেন উজ্জ্বল জেলা পরিষদের প্রশাসক ভিপি মিজানুর রহমান মিজান ও রাজনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল ইসলাম শেলুন, জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি মো. বদরুল আলম, জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকিদুর রহমান সোহান, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক জনি আহমেদসহ বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এদিকে মঞ্চ পরিদর্শন শেষে সোমবার সন্ধ্যায় মৌলভীবাজার পৌরসভা কনফারেন্স রুমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর সফল করতে জেলা বিএনপি, সদর উপজেলা বিএনপি, রাজনগর উপজেলা বিএনপি, মৌলভীবাজার পৌর বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে এক যৌথ প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফয়জুল করিম ময়ূনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভা পরিচালনা করেন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুর রহিম রিপন। সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এম নাসের রহমান বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। এই সফর শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং মৌলভীবাজারের উন্নয়ন সম্ভাবনা ও জেলার দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো জাতীয় পর্যায়ে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার একটি বড় সুযোগ। তিনি নেতাকর্মীদের শৃঙ্খলা বজায় রাখা, আগত অতিথিদের যথাযথ অভ্যর্থনা নিশ্চিত করা এবং কর্মসূচিকে সফল করতে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেন। সভায় জেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ, রাজনগর উপজেলা বিএনপির সুপার ফাইভ সদর উপজেলা বিএনপির সুপার ফাইভ মৌলভীবাজার পৌর বিএনপির সুপার ফাইভ এবং জেলা, উপজেলা ও পৌর পর্যায়ের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের ‘সুপার ফাইভ’ নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। এ সময় জনসমাগম, শৃঙ্খলা, অভ্যর্থনা, পরিবহন ব্যবস্থা, মাঠ ব্যবস্থাপনা, নেতাকর্মীদের অবস্থান এবং সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সফরকে সফল ও স্মরণীয় করে তুলতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ফ্যামেলি কার্ড পাইলটিং কর্মসূচির আওতায় শ্রীমঙ্গল উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ১৫৫ জন এবং রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ১৫২ জন উপকারভোগীর মধ্যে ফ্যামেলি কার্ড বিতরণ করা হবে। উপকারভোগীদের তালিকা চূড়ান্ত করতে একাধিক ধাপে যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে ইতোমধ্যে নড়েচড়ে বসেছে জেলার সরকারি দপ্তরগুলো। জেলা শহরের সড়ক, সরকারি স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সজ্জিত করার কাজ চলছে। চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। অন্যদিকে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ এবং শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে মঞ্চ নির্মাণসহ অনুষ্ঠানস্থলের প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে। জেলা বিএনপির নেতারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন থেকে হাজার হাজার নেতাকর্মীর অংশগ্রহণে এটি সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক সমাবেশে রূপ নিতে যাচ্ছে। এখন পুরো মৌলভীবাজারের দৃষ্টি ১৭ জুনের দিকে। জেলার মানুষের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর শুধু একটি কর্মসূচির উদ্বোধনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং মেডিকেল কলেজ, শমশেরনগর বিমানবন্দর এবং বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ প্রতিষ্ঠাসহ দীর্ঘদিনের উন্নয়ন স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথও আরও সুগম করবে।

