মৌলভীবাজার শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি
শ্রীমঙ্গলে ২৯ বালুমহাল বন্ধ, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার অবৈধ বালুর বাজারে কারা লাভবান?
মৌলভীবাজারের পর্যটননগরী শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি ছড়াগুলো একসময় ছিল সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম উৎস। বৈধ প্রক্রিয়ায় বালু উত্তোলনের মাধ্যমে সরকার যেমন রাজস্ব পেত, তেমনি স্থানীয় নির্মাণ খাতেও সরবরাহ নিশ্চিত হতো। কিন্তু পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা ও আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে দীর্ঘ প্রায় চার বছর ধরে উপজেলার ২৯টি ছড়ায় বালুমহাল ইজারা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফলে একদিকে সরকার হারাচ্ছে সম্ভাব্য কোটি কোটি টাকার রাজস্ব, অন্যদিকে বৈধ বালুর সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে তৈরি হয়েছে সংকট। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সংকটক
ে পুঁজি করে একটি শ্রেণি অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রি করছে। প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে জরিমানা ও কারাদণ্ড দিলেও পুরো পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। এখন প্রশ্ন উঠছে ইজারা বন্ধ থাকলেও বাজারে বালু আসছে কোথা থেকে? কারা উত্তোলন করছে? কারা পরিবহন ও বিক্রি করছে? আর এই অবৈধ বালুর ব্যবসার সঙ্গে কোনো সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট জড়িত কি না তা কি যথাযথভাবে অনুসন্ধান করা হয়েছে? রিটের পর বন্ধ ২৯ বালুমহাল জানা যায়, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন নং-২৯৪৮/২০১৬ দায়ের করে। রিটে শ্রীমঙ্গল উপজেলার ২৯টি ছড়াসহ মৌলভীবাজার জেলার অন্যান্য উপজেলার আরও ২৩টি মোট ৫২টি ছড়া থেকে সিলিকা বালু উত্তোলন বন্ধের আবেদন করা হয়। বেলার পক্ষ থেকে বলা হয়, পরিবেশগত প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করে পাহাড়ি ছড়া থেকে বালু উত্তোলন করা হলে পাহাড়, রিজার্ভ ফরেস্ট, চা-বাগান, কৃষিজমি, সড়ক, সেতু-কালভার্ট ও বসতবাড়িসহ পরিবেশ ও জনজীবনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট ছড়াগুলো থেকে বালু উত্তোলন ও ইজারা-সংক্রান্ত কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এরপর শ্রীমঙ্গলের ২৯টি ছড়ার বালুমহাল ইজারা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার, হিসাব কত? বালুমহাল ইজারা সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব ছড়া থেকে বৈধভাবে বালু উত্তোলনের মাধ্যমে অতীতে সরকার উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পেয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ইজারা বন্ধ থাকায় সরকার সম্ভাব্য কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া জরুরি পরিবেশ রক্ষার জন্য আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকলে রাজস্ব আদায়ের জন্য তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন হলো, দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ রক্ষা, বৈধ বালুর সরবরাহ এবং সরকারি রাজস্ব এই তিনটি বিষয়কে সমন্বয় করে কোনো বিকল্প ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে কি না? বালুর সংকটে নির্মাণ ব্যয় স্থানীয় নির্মাণসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, বৈধ উৎস থেকে বালুর সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। গত কয়েক বছরে বালুর দাম কয়েকগুণ বেড়েছে বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে বাড়ি নির্মাণ থেকে শুরু করে ছোট-বড় স্থাপনা নির্মাণ সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, উপজেলার কয়েকটি জায়গা থেকে বৈধভাবে বালু উত্তোলনের সুযোগ থাকলেও তা স্থানীয় চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এই ঘাটতির সুযোগেই অবৈধ উত্তোলনকারীরা সক্রিয় হয়ে উঠছে। ইজারা বন্ধ, কিন্তু অবৈধ উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না কেন? প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছে। জেল জরিমানা ও সরঞ্জাম জব্দের ঘটনাও ঘটেছে। তারপরও যদি অবৈধ বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায় অভিযানগুলো কি কেবল বিচ্ছিন্ন, নাকি এর পেছনে থাকা মূল চক্র শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? একটি ট্রাক বা ড্রেজার জব্দ করা সহজ; কিন্তু এর পেছনে যদি থাকে উত্তোলনকারী, পরিবহনকারী, মজুতকারী ও বিক্রেতার সমন্বিত নেটওয়ার্ক তাহলে সেই নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।তথ্যবক্স| যা জানা জরুরি উপজেলা: শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজারইজারা বন্ধ: প্রায় ৪ বছর শ্রীমঙ্গলে সংশ্লিষ্ট ছড়া: ২৯টি মৌলভীবাজারে মোট সংশ্লিষ্ট ছড়া: ৫২টি রিট: ২৯৪৮/২০১৬ আদালত: হাইকোর্ট বিভাগ অভিযোগ: অবৈধ বালু উত্তোলন ও অতিরিক্ত দামে বিক্রি প্রভাব: বালুর সরবরাহ সংকট, মূল্যবৃদ্ধি ও নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি মূল চ্যালেঞ্জ: পরিবেশ সংরক্ষণ, বৈধ সরবরাহ ও সরকারি রাজস্ব তিনটির সমন্বয়। পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি ছড়া শুধু বালুর উৎস নয়। এসব ছড়া স্থানীয় জলপ্রবাহ, জীববৈচিত্র্য ও পাহাড়ি পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করলে ছড়ার তলদেশ ও পাড় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে ভূমিক্ষয়, পাহাড়ি ঢল, পানিপ্রবাহের পরিবর্তন এবং আশপাশের সড়ক, সেতু, কৃষিজমি ও বসতবাড়ির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই কেবল রাজস্ব আদায়ের জন্য বালুমহাল খুলে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং আদালতের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থাপনা। যেখানে পরিবেশগতভাবে নিরাপদ, সেখানে নির্ধারিত সীমা ও শর্ত মেনে বালু ব্যবস্থাপনার সুযোগ আছে কি না, সেটিও বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে যাচাই করা যেতে পারে। প্রশাসনের কাছে জবাবদিহিমূলক প্রশ্ন ২৯টি বালুমহাল দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় সরকার সম্ভাব্য কত টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে? আদালতের নিষেধাজ্ঞার পর এসব ছড়ার বর্তমান পরিবেশগত অবস্থা নিয়ে সর্বশেষ কোনো বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা হয়েছে কি? ইজারা বন্ধ থাকা অবস্থায় শ্রীমঙ্গলের বাজারে বৈধভাবে আসা বালুর উৎস কী? অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে গত চার বছরে কতটি অভিযান হয়েছে এবং কতজনের বিরুদ্ধে মামলা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? অবৈধ উত্তোলনের সঙ্গে কোনো সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট জড়িত থাকলে তাদের শনাক্ত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? বালুর বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের কোনো বাজার মনিটরিং আছে কি? পরিবেশ রক্ষা ও সরকারি রাজস্ব দুই বিষয় সমন্বয় করে বিকল্প বালু ব্যবস্থাপনার কোনো পরিকল্পনা আছে কি? আদালতের নির্দেশনা ও পরিবেশগত শর্ত মেনে ভবিষ্যতে কোথাও সীমিত ও বৈজ্ঞানিকভাবে বালু উত্তোলন সম্ভব কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান কী? সমাধান কি শুধু ইজারা, নাকি আরও কিছু? শ্রীমঙ্গলের ২৯টি বালুমহাল বছরের পর বছর বন্ধ থাকবে এমন পরিস্থিতি যেমন স্থায়ী সমাধান নয়, তেমনি পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টি উপেক্ষা করে নির্বিচারে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজন এমন একটি স্বচ্ছ, বৈজ্ঞানিক ও আইনসম্মত বালু ব্যবস্থাপনা নীতি, যেখানে নির্ধারিত হবে কোথায় বালু উত্তোলন করা যাবে, কতটুকু উত্তোলন করা যাবে, কোন মৌসুমে উত্তোলন করা যাবে এবং পরিবেশের ক্ষতি হলে দায়ী কে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন উৎস থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহ চেইন নজরদারি। কারণ প্রশ্নটি এখন শুধু সরকারের রাজস্ব হারানোর নয়। প্রশ্ন হলো বৈধ পথ বন্ধ থাকলে অবৈধ পথ কি আরও শক্তিশালী হচ্ছে? শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি ছড়া, পরিবেশ ও জনস্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব নিশ্চিত করতে হলে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হবে। পরিবেশ রক্ষা হোক, রাজস্বও আসুক কিন্তু কোনোভাবেই যেন অবৈধ বালুর সিন্ডিকেট লাভবান না হয়।

