মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
মৌলভীবাজার জেলা হাসপাতাল চত্বরে কথিত অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য
মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল জেলার প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র। প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন উপজেলা, হাওরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকা থেকে শত শত রোগী চিকিৎসার আশায় এখানে আসেন। কিন্তু হাসপাতালকে ঘিরে জরুরি রোগী পরিবহনের অন্যতম মাধ্যম অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ জমতে জমতে এখন তা জনঅসন্তোষে রূপ নিয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, হাসপাতাল চত্বর ও সংলগ্ন এলাকায় একটি প্রভাবশালী চক্র অ্যাম্বুলেন্স সেবার নামে অনিয়ম, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং দখলবাজির রাজত্ব কায়েম করেছে। সরেজমিনে দেখা
যায়, জেলা হাসপাতালের মূল ফটক, সামনের সড়ক এবং পাশ্ববর্তী ইপিআই ভবনের সম্মুখেও সারিবদ্ধভাবে কয়েকটি গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে। এর মধ্যে কিছু গাড়ি দেখতে সাধারণ মাইক্রোবাস, নোহা, হাইএস বা ভ্যানজাতীয় হলেও সেগুলো অ্যাম্বুলেন্স পরিচয়ে রোগী বহন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা দাবি করেছেন, প্রকৃত অ্যাম্বুলেন্সের নির্ধারিত ৭১/৭৪ সিরিজ নম্বরের বাইরে থাকা কিছু যানবাহনও নিয়মিত রোগী পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব গাড়ির বৈধতা, ফিটনেস, বীমা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন নাগরিকরা। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, জরুরি মুহূর্তে যখন একজন মানুষ জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকেন, ঠিক তখনই অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করা হয়। সিলেট, ঢাকা কিংবা অন্যত্র রোগী নিতে গেলে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকা চাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেকেই বলেন, দর কষাকষির সুযোগ থাকে না। রোগীর অবস্থা গুরুতর হওয়ায় বাধ্য হয়ে যা চাওয়া হয় তাই দিতে হয়। শুধু ভাড়া নৈরাজ্য নয়, কিছু গাড়িতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা সামগ্রীও নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। একাধিক ভুক্তভোগী জানান, অক্সিজেন সিলিন্ডার, স্ট্রেচার, প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম কিংবা জরুরি সাপোর্ট ব্যবস্থা ছাড়াই রোগী পরিবহন করা হচ্ছে। এতে পথেই রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটার ঝুঁকি থেকে যায়। হাসপাতাল চত্বরে আরেকটি বড় সমস্যা হলো অবৈধ দোকানপাট ও অস্থায়ী চা-স্টল। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মূল ফটক সংলগ্ন এলাকা, হাসপাতালের প্রবেশপথ এবং ইপিআই ভবনের আশপাশে দোকান বসে থাকায় রোগী ও স্বজনদের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্স ঢোকা-বের হওয়াও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব স্থানে সারাদিন কিছু বখাটে ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আড্ডা চলে, যা হাসপাতালের পরিবেশকে অস্বস্তিকর করে তুলেছে। কিছু এলাকাবাসী আরও অভিযোগ করেন, হাসপাতাল কম্পাউন্ডের নির্জন স্থান, পরিত্যক্ত অংশ, নতুন ভবনের সিঁড়িঘর এবং আশপাশের ফাঁকা জায়গা ব্যবহার করে মাদক সেবন, চুরি ও অসামাজিক কার্যকলাপ সংঘটিত হয়। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন, তবুও বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। এদিকে স্থানীয়দের একাংশের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতাল এলাকায় প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত এনএসআই ও ডিএসবি কর্মকর্তাদের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও কেন দৃশ্যমান ও জোরালো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, এত অভিযোগের পরও কার্যকর নজরদারি ও সমন্বিত অভিযান কেন নিয়মিত হচ্ছে না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন মোঃ মামুনুর রহমান জানান, হাসপাতাল চত্বর দখলমুক্ত করতে তিনি জেলা প্রশাসককে অবহিত করে একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুনরায় অভিযান চালানো হবে বলেও তিনি জানান। সচেতন মহলের মতে, একটি হাসপাতাল শুধু চিকিৎসা কেন্দ্র নয়, এটি মানুষের আস্থা ও আশ্রয়ের জায়গা। সেখানে যদি বিশৃঙ্খলা, দখলদারিত্ব, অবৈধ ভাড়া আদায় এবং নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করে, তবে তা পুরো স্বাস্থ্যসেবাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। তারা মনে করেন, জেলা প্রশাসন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, বিআরটিএ, পুলিশ, এনএসআই ও ডিএসবি’র সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। স্থানীয়দের দাবি, হাসপাতাল ও ইপিআই ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সব গাড়ির কাগজপত্র যাচাই, বৈধ ৭১/৭৪ সিরিজ ছাড়া অবৈধ যান অপসারণ, নির্ধারিত ভাড়া তালিকা টানানো, চালকদের নিবন্ধন এবং পুরো হাসপাতাল এলাকা দখলমুক্ত করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হোক। কারণ একটি অ্যাম্বুলেন্স অনেক সময় একজন মানুষের শেষ ভরসা, আর সেই ভরসার জায়গাটি কোনোভাবেই অনিয়মের হাতে জিম্মি থাকতে পারে না।

