নিউজ ডেক্স:
আলাদা প্রদেশ’ বিতর্কে তোলপাড়: চৈতালীর গ্রেপ্তার, বিচার ও আইনজীবী সনদ বাতিলের দাবি হেফাজতের
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী চৈতালী চক্রবর্তীকে ঘিরে বিতর্ক। তার একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশের অন্যতম ধর্মভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সংগঠনটি চৈতালী চক্রবর্তীর গ্রেপ্তার, বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার এবং তার আইনজীবী সনদ স্থায়ীভাবে বাতিলের দাবি তুলে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। রোববার (২১ জুন) হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিববুল্লাহ বাবুনগরী এবং মহাসচিব আল্লামা শায়েখ সাজি
দুর রহমান স্বাক্ষরিত এক যৌথ বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়। একইসঙ্গে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষার স্বার্থে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে জড়িতদের খুঁজে বের করতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতিও আহ্বান জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে ‘এশিয়ার সর্ববৃহৎ রামমূর্তি’ স্থাপনের উদ্যোগ এবং চৈতালী চক্রবর্তীর কথিত ‘হিন্দুদের জন্য আলাদা প্রদেশ’ গঠনের দাবিসংবলিত বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করা হয়। হেফাজতের মতে, এসব কর্মকাণ্ড দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা, সামাজিক সম্প্রীতি ও জাতীয় ঐক্যের জন্য হুমকিস্বরূপ এবং পরিকল্পিতভাবে বিভাজন সৃষ্টির অপচেষ্টা। সংগঠনটির নেতারা বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, অখণ্ড ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। দীর্ঘদিন ধরে এ দেশের বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষ পারস্পরিক সহাবস্থান ও সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে বসবাস করে আসছে। সেই ঐতিহ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কিংবা দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিয়ে কোনো ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করার সুযোগ নেই। তাদের ভাষ্যমতে, রাষ্ট্রের ভেতরে নতুন কোনো প্রদেশ বা পৃথক অঞ্চল গঠনের দাবি দেশের সংবিধান, জাতীয় স্বার্থ এবং সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। হেফাজতের নেতৃদ্বয় অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিশেষ মহল দেশের অভ্যন্তরে বিভেদ, উত্তেজনা ও অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। তারা মনে করেন, চৈতালী চক্রবর্তীর বক্তব্য কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি বৃহত্তর কোনো পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। এ ধরনের বক্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও তারা মন্তব্য করেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, স্বাধীন বাংলাদেশের ভূখণ্ড বা রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়ে কোনো ধরনের বিভাজনমূলক বক্তব্য জনগণের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। এ ধরনের মন্তব্য যদি ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়ে থাকে, তবে তা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। হেফাজতে ইসলাম মনে করে, দেশের চলমান শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ণ রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের আরও সতর্ক ভূমিকা প্রয়োজন। সংগঠনটির দাবি, যেকোনো ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য, বিভেদমূলক প্রচারণা কিংবা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা উচিত। একইসঙ্গে তারা সরকারকে অনুরোধ জানায়, দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সম্ভাব্য ষড়যন্ত্র বা নাশকতামূলক তৎপরতার বিষয়ে সতর্ক নজরদারি বাড়ানোর আহ্বানও জানানো হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন বক্তব্য ও মতামতকে কেন্দ্র করে জনমনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে যেকোনো বিতর্কিত বক্তব্য দ্রুতই জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসছে। এ অবস্থায় দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও পেশাজীবীদের বক্তব্য প্রদানের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসছে বিভিন্ন মহলে। তবে যে কোনো অভিযোগ বা বিতর্কের ক্ষেত্রে আইনের শাসন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ন্যায়বিচারের নীতিই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ—এমন মতও প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা। তাদের মতে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই হওয়া উচিত এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। সব মিলিয়ে, চৈতালী চক্রবর্তীকে ঘিরে উদ্ভূত এই বিতর্ক নতুন করে জাতীয় ঐক্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। হেফাজতে ইসলামের এই দাবির পর বিষয়টি নিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলের।

