প্রতিবেদক: তারফদার মামুন
নিরাপদ পানির অভাবে দুর্ভোগে ৩ লাখ মানুষ, শুষ্ক মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ
মৌলভীবাজারের ৪০ ইউনিয়নে ভয়াবহ পানি সংকট মৌলভীবাজার জেলার সাতটি উপজেলার অন্তত ৪০টি ইউনিয়নে তীব্র আকার ধারণ করেছে খাবার পানির সংকট। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় প্রায় ৩ লাখ মানুষ নিরাপদ পানির অভাবে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বিশেষ করে নদী ও হাওরসংলগ্ন এলাকায় বসবাসরত মানুষ এ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজার সদর, রাজনগর, শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া ও জুড়ী উপজেলার বহু এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ২২ ফুটের নিচে নেমে গেছ
ে। ফলে সাধারণ নলকূপে বছরের অধিকাংশ সময় পানি পাওয়া যায় না। কেবল মে থেকে জুলাই মাসে স্বল্প সময়ের জন্য কিছু এলাকায় পানি ওঠে, বাকি সময় মানুষকে নির্ভর করতে হয় অন্যের বাড়ির ডিপ টিউবওয়েলের ওপর। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে রাজনগর উপজেলায়। ফতেপুর ইউনিয়নের তুলাপুর, সাদাপুর ও কুশিয়ারা নদীতীরবর্তী হামিদপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায় পানিবঞ্চিত মানুষের করুণ চিত্র। অনেক পরিবারকে তিন–চার বাড়ি দূর থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। কেউ কেউ মাসে অর্থের বিনিময়ে পানি আনতে বাধ্য হচ্ছেন। হামিদপুর গ্রামের আনোয়ারা বেগম জানান, নলকূপে পানি তুলতে নদী থেকে বালতি ভরে পানি এনে ঢালতে হয়। তাতেও অনেক সময় পানি ওঠে না। বাধ্য হয়ে অন্যের বাড়ি থেকে পানি আনতে হয়, যার জন্য প্রতি মাসে ১০০ টাকা দিতে হচ্ছে। আর্থিক অনটনের কারণে নিজস্ব ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে না। তুলাপুর গ্রামের রঞ্জণ দাস বলেন, “নদীর কাছেই আমাদের বাড়ি। তিন বছর ধরে শুষ্ক মৌসুম এলেই পানির স্তর নিচে নেমে যায়। মাঘ থেকে চৈত্র পর্যন্ত নলকূপে পানি পাওয়া যায় না। পানির অভাবে আমাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।” স্থানীয়রা জানান, শুধু একটি বা দুটি পরিবার নয়—নদীতীরবর্তী ও নিচু এলাকার শত শত পরিবার একই সমস্যায় ভুগছে। পানির অভাবে অনেক বাড়ির নলকূপ পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। রান্না, কাপড় ধোয়া ও গৃহস্থালির কাজে বাধ্য হয়ে কুশিয়ারা নদীর দূষিত পানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কেউ কেউ নলকূপে বৈদ্যুতিক মোটর বা কম্প্রেশার বসিয়েও পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছেন না। ফতেপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য এমদাদুল হক টিটু বলেন, “নদী তীরবর্তী এলাকায় সাধারণ টিউবওয়েল দিয়ে আর পানির চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। এ সংকট নিরসনে সরকারের সুপরিকল্পিত উদ্যোগ জরুরি।” এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. খালেদুজ্জামান বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়াই সংকটের প্রধান কারণ। জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে আবেদন এলে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দীর্ঘদিনের এই মানবিক সংকট থেকে মুক্তি পেতে দ্রুত কার্যকর সরকারি উদ্যোগের দিকে তাকিয়ে আছেন পানিবঞ্চিত মৌলভীবাজারের মানুষ।

