প্রতিবেদক: তারফদার মামুন
সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি কোটি টাকার বাস টার্মিনাল, শহর আজও যানজটে নাকাল
মৌলভীবাজার শহরের মানুষের প্রতিদিনের জীবন আজও দুর্ভোগ, ঝুঁকি ও হতাশার মধ্যেই কাটছে। শহরের জুগিডর এলাকায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক বাস টার্মিনালটি উদ্বোধনের এক যুগ পার হলেও কার্যকরভাবে চালু হয়নি—আগেও নয়, আজও নয়। উন্নয়নের নামে নির্মিত এই স্থাপনাটি এখন অব্যবস্থাপনা ও দায়হীনতার নীরব সাক্ষী। সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী মরহুম সাইফুর রহমানের স্বপ্ন ছিল মৌলভীবাজারকে যানজটমুক্ত, নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন নগর হিসেবে গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে শহরের বাইরে জুগিডর এলাকায় তিন একর জমির ওপর
এই আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়। ২০০৭ সালে পৌরসভা ও নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে কাজ শুরু হয়ে ২০১০ সালে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলেও অল্প সময়ের পরীক্ষামূলক চলাচলের পরই সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে টার্মিনালটি পড়ে আছে অচল অবস্থায়—ভবন জীর্ণ হচ্ছে, সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে। এর খেসারত দিচ্ছে শহরবাসী প্রতিদিন। প্রধান সড়ক ও মহাসড়কের ওপর বাস দাঁড় করানোয় যাত্রীদের নামতে হচ্ছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। শিক্ষার্থীরা সময়মতো স্কুলে পৌঁছাতে পারছে না, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স যানজটে আটকে পড়ছে, কর্মজীবীরা দেরিতে কর্মস্থলে পৌঁছাচ্ছেন। শহরের প্রতিটি দিন যেন অগোছালো ও অনিরাপদ এক বাস্তবতার নাম। শুধু শহর নয়—গ্রামাঞ্চলের মানুষও এই বাস টার্মিনাল দ্রুত চালুর দাবি জানাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, যত দিন যাচ্ছে টার্মিনালটি ব্যবহারের বদলে সেখানে বাড়ছে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা। অবৈধভাবে দোকানপাট বসছে, অনুমোদনহীনভাবে পণ্য ও খাবার বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ আরও উদ্বেগজনক। প্রায় প্রতিরাতেই পরিত্যক্ত জুগিডর বাস টার্মিনাল এলাকায় নেশাদ্রব্যের কেনাবেচা চলে। কিছু যুবক এখানে গভীর রাত পর্যন্ত জড়ো হয়ে মাদক সেবন ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকে। পর্যাপ্ত প্রশাসনিক নজরদারি না থাকায় এলাকাটি ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে—যা জননিরাপত্তা ও সামাজিক পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। শহরবাসীর প্রশ্ন স্পষ্ট—জনপ্রতিনিধি বদলেছে, প্রশাসন বদলেছে, কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি সচল করার দায়িত্ব কেউ নেয়নি কেন? একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের স্বার্থে কি কোটি টাকার এই বাস টার্মিনাল ইচ্ছাকৃতভাবেই অচল করে রাখা হয়েছে? প্রশ্নগুলো আজ আর কেবল গুঞ্জন নয়, জনমতের ভাষা। বাস টার্মিনালটি চালু হলে শহরের যান চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরবে, মহাসড়কে অবৈধভাবে বাস দাঁড়ানো বন্ধ হবে, শিক্ষার্থী, রোগী ও সাধারণ মানুষ স্বস্তি পাবে। একই সঙ্গে টার্মিনাল এলাকাও ফিরে পাবে নিরাপত্তা ও নিয়মকানুনের আওতা। অথচ বাস্তবে এটি এখন অবহেলা ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনার এক জীবন্ত প্রতীক। শহর ও গ্রামের মানুষ এখন আর প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চায়। তাদের একটাই দাবি—এই কোটি টাকার জুগিডর বাস টার্মিনাল অবিলম্বে ব্যবহারের আওতায় আনা হোক। নচেৎ, এটি উন্নয়নের স্মারক হিসেবে নয়—বরং ব্যর্থতা ও দায়িত্বহীনতার ইতিহাস হিসেবেই থেকে যাবে। কারণ প্রকৃত উন্নয়ন কেবল ইট-পাথরের স্থাপনায় নয়— মানুষের জীবন, নিরাপত্তা, সময় ও স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে দেওয়াতেই তার প্রকৃত সার্থকতা।

