মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
কুকুরই যখন বাঘ এআইয়ের ফাঁদে সিসিটিভিতে মিলল আসল সত্য
মৌলভীবাজার শহরের ধরকাপনে বাঘ দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন একটি ভিডিও ৩১ আগস্ট মুহূর্তেই তৈরি করে আতঙ্ক। ভিডিওতে ভয়েস ওভার দিয়ে বাঘ দেখার দাবি করা হয়। সাংবাদিকসহ স্থানীয় অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারীও ভিডিওটি পোস্ট ও শেয়ার করেন। ফলে যাচাইয়ের আগেই একটি সাধারণ প্রাণী মানুষের চোখে ‘বাঘ’ হয়ে ওঠে। কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া মূল সিসিটিভি ফুটেজ সামনে আসার পর পাল্টে যায় পুরো চিত্র। বাঘ নয়, ভোররাতের সেই ফুটেজে দেখা যায় একটি সাধারণ বেওয়ারিশ কুকুর। গণমাধ্যম কর্মীরা সরেজমিনে ধরকাপন এলাকায়
গিয়ে সংশ্লিষ্ট বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করেন। ফুটেজে দেখা যায়, ৩১ আগস্ট ভোররাত ৪টা ১৭ মিনিটে, ফজরের আজানের ঠিক আগে, স্থানীয় আলহাজ্ব সৈয়দ আব্দুল খালিকের বাড়ি (সাহেব বাড়ির)প্রধান ফটকের সামনে দিয়ে একটি কুকুর স্বাভাবিকভাবে হেঁটে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, এই সিসিটিভি ফুটেজ থেকেই কুকুরের চলাচলের দৃশ্য নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেটির অবয়ব বাঘের মতো করে তৈরি করা হয়। এরপর ভয়েস ওভার যুক্ত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হলে সেটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে পড়ে। এখানেই শেষ নয়। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্য সৈয়দ এনায়েত হোসেন জানান, বাড়ির পাহারাদার আলামিন গেটের সামনে দিয়ে বড় কিছু একটা হেঁটে যেতে দেখেছেন বলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। পরে সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হলে সেখানে বড় কোনো প্রাণী নয়, কুকুর দেখা যায়। ফুটেজটি সিরাজুল আরেফিন জিনাছ ও পাহারাদার আলামিনকে দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি জানান। সৈয়দ ইয়াসির আরাফাত বলেন, তাদের সিসিটিভিতে কুকুরই দেখা গেছে। কিন্তু পরে সেটিকে এআই দিয়ে পরিবর্তন করে বাঘ হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়ায় এলাকায় আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। আত্মীয়স্বজনও ফোন করে বিষয়টি জানতে চাচ্ছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে সবাইকে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেনএটা কুকুর ছিল, বাঘ নয়। প্রশ্নটা শুধু বাঘের নয় ঘটনাটি এখন আর শুধু একটি ভাইরাল ভিডিওর সত্য-মিথ্যার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্ব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারের বড় প্রশ্ন। একজন সাংবাদিকের হাতে কোনো চাঞ্চল্যকর ভিডিও এলে প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত সত্যতা নিশ্চিত করা, দ্রুততম সময়ে প্রকাশ করা নয়। কারণ সবার আগে প্রকাশিত ভুল সংবাদ মুহূর্তে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। পরে সংশোধনী প্রকাশ করলেও প্রথম তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি সবসময় পুরোপুরি দূর হয় না। বিশেষ করে সিনিয়র সাংবাদিকদের একটি সামাজিক দায়িত্ব আরও বেশি। তাঁদের একটি পোস্ট বা শেয়ার সাধারণ ব্যবহারকারীরা তুলনামূলক বেশি বিশ্বাস করেন। ফলে যাচাইহীন কোনো ভিডিও তাঁরা প্রকাশ বা শেয়ার করলে তার প্রভাবও বহুগুণ বাড়ে। টেলিভিশনের ক্ষেত্রে সম্প্রচারের আগে রিপোর্টার, ভিডিও এডিটর, নিউজ ডেস্ক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্পাদকের পর্যায়ে যাচাই হওয়া প্রয়োজন। পত্রিকার ক্ষেত্রেও একইভাবে রিপোর্টের উৎস, সময়, স্থান, ছবি ও ভিডিও ক্রস-চেক করা জরুরি। কোনো ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে এটি কখনোই তার সত্যতার প্রমাণ নয়। বরং ভিডিও যত বেশি চাঞ্চল্যকর এবং যত দ্রুত ছড়ায়, সাংবাদিকের যাচাইয়ের দায়িত্ব তত বেশি। এআইয়ের যুগে সাংবাদিকদের আরও একটি বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। শুধু চোখে দেখে ভিডিও সত্য ধরে নেওয়ার সুযোগ ক্রমেই কমছে। ভিডিওর মূল উৎস, পূর্বের ও পরের ফুটেজ, ঘটনাস্থল, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং সম্ভব হলে মূল সিসিটিভি ফুটেজ সবকিছু মিলিয়ে দেখতে হবে। প্রয়োজনে প্রযুক্তিগত যাচাইয়ের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। তবে কোনো একটি এআই ডিটেকশন টুলের ফলাফলকেও এককভাবে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। ধরকাপনের ঘটনা তাই একটি বড় শিক্ষা দিয়ে গেল ভাইরাল হওয়ার আগে সত্যতা যাচাই না করলে কুকুরও বাঘ হয়ে যেতে পারে। সাংবাদিকতার শক্তি দ্রুততায় নয়, বিশ্বাসযোগ্যতায়। একটি সংবাদ কয়েক মিনিট দেরিতে প্রকাশিত হলে হয়তো ‘ব্রেকিং’ হওয়ার গৌরব কমে যাবে; কিন্তু ভুল সংবাদ প্রকাশের দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। আজ এআই একটি কুকুরকে বাঘ বানিয়েছে। আগামী দিনে হয়তো আরও বড় কোনো ঘটনা, বক্তব্য কিংবা দৃশ্যকে কৃত্রিমভাবে পরিবর্তন করে মানুষের সামনে হাজির করা হবে। তখন সাংবাদিকতার সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে চোখ যা দেখছে, সেটিই কি সত্য, নাকি সত্য খুঁজতে আরও একবার পেছনে ফিরতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর একটাই দেখেছি বলে নয়, যাচাই করেছি বলেই সংবাদ। আর একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় ‘সবার আগে প্রকাশ করা’ নয়; সবার আগে সত্যকে চিনতে পারা।

