মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
বিশ্বমঞ্চে মৌলভীবাজারের গর্ব: ফিফা বিশ্বকাপে অফিশিয়াল দায়িত্বে সুমাইয়া আহমেদ রিদি
কুলাউড়ার কৃতি সন্তান এবার ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আসরে কানাডার টরন্টো ভেন্যুতে পালন করবেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব; বহুভাষিক দক্ষতা ও নেতৃত্বগুণে অর্জন করলেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসব, ফিফা বিশ্বকাপ। কোটি কোটি দর্শকের নজর যেখানে নিবদ্ধ থাকে, সেই মহাযজ্ঞে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যেকোনো মানুষের জন্যই এক অসাধারণ অর্জন। আর সেই বিশ্বমঞ্চেই এবার বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করতে যাচ্ছেন মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কৃতি সন্তান সুমাইয়া আহমেদ রিদি। ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর অফিশিয়াল ভ
লান্টিয়ার (স্বেচ্ছাসেবী) হিসেবে নির্বাচিত হয়ে তিনি শুধু নিজের নয়, বরং কুলাউড়া, মৌলভীবাজার, সিলেট এবং সমগ্র বাংলাদেশের জন্য বয়ে এনেছেন এক অনন্য গৌরবের বার্তা। আগামী ১১ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে রেকর্ড ৪৮টি দেশ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই মেগা আসরকে ঘিরে যখন বিশ্বজুড়ে ফুটবল উন্মাদনা তুঙ্গে, ঠিক তখনই বাংলাদেশের জন্য এলো এই আনন্দের সংবাদ। কঠোর প্রতিযোগিতা ও দীর্ঘ নির্বাচন প্রক্রিয়া পেরিয়ে সুমাইয়া আহমেদ রিদি কানাডার টরন্টো ভেন্যুতে অফিশিয়াল প্রতিনিধি ও অ্যাম্বাসেডর হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ অর্জন করেছেন। বর্তমানে কানাডার টরন্টোতে সপরিবারে বসবাসরত রিদি একটি শিক্ষিত ও সুশিক্ষিত পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা শাহিন আহমদ কুলাউড়া সরকারি কলেজের সাবেক ইংরেজি প্রভাষক এবং মা তাহমিনা আক্তার চৌধুরী একজন সাবেক সহকারী শিক্ষিকা। পরিবার থেকেই শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করে তিনি আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছেন। ফিফা বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া নিছক সৌভাগ্যের বিষয় নয়; এর পেছনে প্রয়োজন হয় অসাধারণ দক্ষতা, নেতৃত্ব এবং বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার। সুমাইয়া আহমেদ রিদি সেই যোগ্যতার পরীক্ষায় সফলভাবেই উত্তীর্ণ হয়েছেন। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তিনি সাবলীলভাবে ফ্রেঞ্চ, কোরিয়ান ও হিন্দি ভাষায় কথা বলতে পারেন। মোট পাঁচটি ভাষায় তাঁর দক্ষতা আন্তর্জাতিক পরিবেশে কাজ করার ক্ষেত্রে তাঁকে দিয়েছে বিশেষ সুবিধা। বিশেষ করে কানাডার অন্যতম সরকারি ভাষা ফ্রেঞ্চে তাঁর সাবলীলতা ফিফা কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। এই বহুভাষিক দক্ষতার কারণে বিশ্বকাপ চলাকালে বিভিন্ন দেশের অতিথি, খেলোয়াড়, কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ, সমন্বয় ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। ফিফা বিশ্বকাপে দায়িত্ব পাওয়ার আগেও কানাডার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন রিদি। তিনি ‘ইলেকশন কানাডা’ এবং ‘ইলেকশন অন্টারিও’-এর অধীনে একাধিক নির্বাচনে সফলতার সঙ্গে ‘প্রিসাইডিং অফিসার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রশাসনিক দক্ষতা, দল পরিচালনা, সংকট মোকাবিলা এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা ইতোমধ্যেই প্রশংসিত হয়েছে। বিশ্বকাপের মতো বিশাল আয়োজন পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দর্শনার্থীদের সহায়তা, তথ্য প্রদান, অতিথি ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন কার্যক্রমের সমন্বয় এবং আয়োজকদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার মাধ্যমে একটি সফল টুর্নামেন্ট সম্পন্ন করতে তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এজন্য ফিফা স্বেচ্ছাসেবকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা এবং পেশাগত উন্নয়নের নানা সুযোগ প্রদান করে থাকে। ফিফা সভাপতি Gianni Infantino একবার বলেছিলেন, “স্বেচ্ছাসেবীরাই ফিফা টুর্নামেন্টের হৃদয়, প্রাণ ও হাসি। তারা টুর্নামেন্টের অন্তরালের বাস্তবতা দেখার সুযোগ পায় এবং এমন স্মৃতি অর্জন করে, যা আজীবন তাদের সঙ্গে থাকে।” সেই বিশেষ দলের একজন সদস্য হিসেবে এবার যুক্ত হচ্ছেন বাংলাদেশের কন্যা সুমাইয়া আহমেদ রিদি। তবে আন্তর্জাতিক এই অর্জনের মধ্যেও নিজের শিকড়কে ভুলে যাননি তিনি। রিদির ভাষায়, প্রবাসে অনেক সময় বাংলাদেশিদের অন্য দেশের নাগরিক বলে ভুল করা হয়। কিন্তু তিনি বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে গর্বের সঙ্গে নিজের পরিচয় তুলে ধরতে চান একজন বাংলাদেশি হিসেবে। শুধু বাংলাদেশ নয়, তিনি বিশ্বের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে চান নিজের প্রিয় সিলেট ও কুলাউড়াকেও। তাঁর এই মানসিকতা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। কারণ বিশ্বায়নের এই যুগে আন্তর্জাতিক পরিচয়ের পাশাপাশি নিজের দেশ, সংস্কৃতি ও জন্মভূমির পরিচয়কে ধারণ করাও এক ধরনের দেশপ্রেম। আর সেই দেশপ্রেমের উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছেন সুমাইয়া আহমেদ রিদি। আজকের তরুণ সমাজের জন্য রিদির এই সাফল্য একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে—পরিশ্রম, দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং স্বপ্ন দেখার সাহস থাকলে বিশ্বমঞ্চেও নিজের অবস্থান তৈরি করা সম্ভব। কুলাউড়ার একটি পরিবার থেকে উঠে এসে বিশ্বকাপের মতো মহাযজ্ঞে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ অর্জন করা নিঃসন্দেহে একটি বিরল সম্মান। সুমাইয়া আহমেদ রিদির এই অর্জনে আনন্দিত কুলাউড়া, গর্বিত মৌলভীবাজার, উজ্জ্বল সিলেট এবং অনুপ্রাণিত সমগ্র বাংলাদেশ। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব করতে যাওয়া এই তরুণীর জন্য রইল আন্তরিক শুভকামনা। তাঁর হাত ধরেই বিশ্বমঞ্চে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠুক বাংলাদেশের নাম।

