মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
মৌলভীবাজার সূর্য্যপাশা গ্রামে রাস্তা বন্ধ নিয়ে সংঘর্ষ: শয্যাশায়ী বৃদ্ধ ও মানসিক প্রতিবন্ধী ছেলেকে আসামি
দীর্ঘ কয়েক বছর শহরে বসবাসের পর লন্ডন প্রবাসী মির্জা আলমগীর নিজ পরিবারের সদস্যদের গ্রামের বাড়িতে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য পাঠান। কিন্তু শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের স্বপ্ন নিয়ে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আমতৈল ইউনিয়নের সূর্য্যপাশা গ্রামের পৈতৃক ভিটায় ফিরে আসার কিছুদিনের মধ্যেই তাদের সামনে সৃষ্টি হয় এক চরম দুর্ভোগ। অভিযোগ উঠেছে, পরিবারের একমাত্র যাতায়াতের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আর সেই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় শয্যাশায়ী এক বৃদ্ধ ও তার
মানসিক ভারসাম্যহীন প্রতিবন্ধী ছেলেকে আসামি করায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মির্জা আলমগীরের পরিবারের বসতবাড়ি থেকে মূল সড়কে বের হওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত একটি মাত্র রাস্তা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, একই বাড়ির প্রতিবেশী মুমিন মিয়া ও তার পরিবারের সদস্যরা ওই রাস্তার ওপর খুঁটি পুঁতে, বেড়া নির্মাণ করে এবং সুপারি গাছ রোপণ করে চলাচলের পথ সংকুচিত ও বন্ধ করে দেন। এতে পরিবারের নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ সদস্যদের চলাচল কার্যত দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, রাস্তা নিয়ে বিরোধ নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ চলছিল। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি এবং গ্রাম্য পঞ্চায়েত একাধিকবার বসে সমাধানের উদ্যোগ নিলেও তা স্থায়ী সমাধানে পৌঁছায়নি। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে গত ১৬ জুন, যখন রাস্তার ওপর সুপারি গাছ রোপণ এবং খুঁটি স্থাপনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। প্রতিবেশী রায়না বেগম, আব্দুল কাদের ও তোফায়েল মিয়া জানান, দীর্ঘদিন ধরে যে রাস্তা ব্যবহার করে কয়েকটি পরিবার যাতায়াত করছিল, সেই পথ হঠাৎ করে বন্ধ করে দেওয়ায় বিরোধের সূত্রপাত ঘটে। তারা দাবি করেন, রাস্তা বন্ধ না করলে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটত না। ঘটনার পর উভয় পক্ষ থানায় অভিযোগ দায়ের করে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে মুমিন মিয়ার করা মামলাটি। মামলায় ৮০ বছর বয়সী আব্দুল মিয়াকে ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে। পরিবারের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ও শয্যাশায়ী। এমনকি নিজের চলাফেরার ক্ষমতাও তার নেই। একই মামলায় আসামি করা হয়েছে তার ছেলে ইমরান মিয়াকে, যিনি মানসিক ভারসাম্যহীন ও প্রতিবন্ধী হিসেবে এলাকায় পরিচিত। এ বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকাজুড়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, শারীরিকভাবে অক্ষম ও দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী একজন বৃদ্ধ এবং মানসিক প্রতিবন্ধী একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংঘর্ষে সক্রিয় অংশগ্রহণের অভিযোগ কতটা বাস্তবসম্মত, তা তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। স্থানীয় ইউপি সদস্য গোপাল রায় বলেন, রাস্তার বিষয়টি নিয়ে আমরা একাধিকবার বসেছি। ঘটনার পরও স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে কোনো সমাধান সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে মৌলভীবাজার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, মারামারির ঘটনায় মুমিন মিয়া বাদী হয়ে মামলা করেছেন। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন এবং আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এদিকে এলাকাবাসীর দাবি, শুধু সংঘর্ষের ঘটনার তদন্ত করলেই হবে না; বিরোধের মূল কারণ অর্থাৎ যাতায়াতের রাস্তা বন্ধ করার অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। তারা মনে করেন, দীর্ঘদিনের এই বিরোধের স্থায়ী সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে। গ্রামবাসীরা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন, অসহায় ও নিরীহ ব্যক্তিদের হয়রানি বন্ধ এবং রাস্তা সংক্রান্ত বিরোধের স্থায়ী সমাধানের জোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষায়, একটি পরিবারের একমাত্র চলাচলের পথ বন্ধ করে দেওয়া যেমন মানবিক নয়, তেমনি শয্যাশায়ী বৃদ্ধ ও মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে মামলার আসামি করাও জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এখন সবাই তাকিয়ে আছে প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকার দিকে।

