প্রতিবেদক: তারফদার মামুন
ভোটের হাওয়া থমকে আছে—জনমনে অনাগ্রহ নাকি আস্থা সংকট?
জাগ্রত বার্তা ডেস্ক: দেশে নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে—এটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু বাস্তবতা এটাও যে, নির্বাচন যতই কাছে আসুক, জনজীবনে ভোটের সেই স্বাভাবিক উত্তাপ ও আবহ যেন অনুপস্থিত। সাধারণত নির্বাচন মানেই মানুষের মধ্যে এক ধরনের প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়; হাট-বাজারে প্রার্থীদের আলোচনা, পাড়া-মহল্লায় প্রচারণার তোড়জোড়, চায়ের দোকানে তর্ক-বিতর্ক, দলীয় কর্মীদের দৌড়ঝাঁপ—সব মিলিয়ে সমাজজুড়ে তৈরি হয় এক উৎসবমুখর পরিবেশ। কিন্তু এবারের দৃশ্যপট ভিন্ন। প্রশ্ন উঠছে—নির্বাচনী আমেজের এই শূন্যতা কেন? নির্বাচন হলো গণ
তন্ত্রের প্রাণ। সেখানে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই নির্বাচনকে অর্থবহ করে তোলে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, ভোটের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমছে, আস্থার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। এর পেছনে একাধিক কারণ আছে—যা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। প্রথমত, আস্থা সংকট। বিগত অভিজ্ঞতা মানুষের মনে এমন ধারণা জন্ম দিয়েছে যে ভোটের মাধ্যমে আদৌ কতটা পরিবর্তন সম্ভব—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ভোটাধিকার ও ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংশয় থাকলে নির্বাচনী উদ্দীপনা তৈরি হওয়া কঠিন। ফলে জনগণের বড় একটি অংশ ‘ভোট হবে কি হবে না’—এর চেয়ে বেশি ভাবছে—ভোট দিলেও কি আমার মতামত প্রতিফলিত হবে? দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রতিযোগিতার বাস্তব চিত্র। একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মাঠ, শক্তিশালী রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং সমান সুযোগ। কিন্তু দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ও নির্বাচনী কৌশল ঘিরে যে দ্বিধা ও টানাপোড়েন চলছে, তাতে সাধারণ মানুষও অনিশ্চিত অবস্থানে থেকে যাচ্ছে। রাজনৈতিক মাঠে স্পষ্টতা না থাকলে জনমনে নির্বাচনী উত্তাপ তৈরি হয় না; বরং জন্ম নেয় অপেক্ষা, শঙ্কা ও উদাসীনতা। তৃতীয়ত, দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম মানুষের মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে। বাজারের মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের দাম, কর্মসংস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষাখরচ—এসব বাস্তব চাপের মধ্যে সাধারণ মানুষ নির্বাচনী আলোচনা নিয়ে মেতে ওঠার অবস্থায় নেই। অনেকের কাছে রাজনীতি এখন আর অগ্রাধিকার নয়; বরং পরিবার চালানোই সবচেয়ে বড় লড়াই। ফলে নির্বাচন থাকলেও মনস্তাত্ত্বিকভাবে মানুষ আগের মতো সম্পৃক্ত হচ্ছে না। চতুর্থত, নিরাপত্তা ও উত্তেজনার আশঙ্কা। আমাদের দেশে বহু সময় নির্বাচন মানেই সংঘাত, সহিংসতা কিংবা চাপ-ভীতির পরিস্থিতি তৈরি হয়—এমন ধারণাও মানুষের মধ্যে রয়েছে। ভোট দিতে গিয়ে অনিশ্চয়তা বা ঝুঁকির আশঙ্কা থাকলে নাগরিক অংশগ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। নির্বাচন মানুষকে সাহসী ও স্বাধীন নাগরিক হিসেবে দাঁড় করানোর কথা, কিন্তু পরিবেশ যদি উল্টো আতঙ্ক সৃষ্টি করে, তবে সেটি গণতন্ত্রের জন্য অশুভ বার্তা। তবু আমাদের মনে রাখতে হবে—নির্বাচন কেবল সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার বৈধতা ও জনগণের রায় প্রকাশের সর্বোচ্চ মাধ্যম। তাই নির্বাচনকে অর্থবহ করতে হলে ভোটের আমেজ কৃত্রিমভাবে তৈরি নয়, বাস্তব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের আস্থা ফেরাতে হবে, রাজনৈতিক সহনশীলতা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে, এবং সবচেয়ে জরুরি—মানুষকে বিশ্বাস করাতে হবে যে ভোট সত্যিই মূল্যবান। আজ যে নীরবতা দেখা যাচ্ছে, তা শুধু অনাগ্রহ নয়—এটি অনেকাংশে হতাশা, অবিশ্বাস ও অনিশ্চয়তার প্রতিফলন। এই নীরবতা ভাঙতে না পারলে ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক কাঠামো আরও দুর্বল হয়ে পড়বে—যার দায় রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজ—তিন পক্ষকেই নিতে হবে। অতএব, নির্বাচন সামনে থাকলেও ভোটের আমেজ না থাকার এই বাস্তবতা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা জরুরি। কারণ, গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো মানুষকে নির্বাচন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া—চাপে নয়, অনাগ্রহের মাধ্যমে।

