রবিউল ইসলাম বাবুল লালমনিরহাট প্রতিনিধিঃ
লালমনিরহাটে মাদক জুয়া সিন্ডিকেটের নগ্ন থাবা। প্রতিবাদী শিক্ষকের জীবন সঙ্কটাপন্ন, এখনও অধরা মূলহোতা।।
লালমনিরহাটে মাদক জুয়া সিন্ডিকেটের নগ্ন থাবা। একটি সুন্দর ও সুস্থ সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখা কি অপরাধ? লালমনিরহাটের আদিতমারীর শিক্ষক আরিফুল ইসলাম (৩৫) জীবনের বর্তমান পরিণতি দেখে এমন প্রশ্নই হয়তো জাগছে স্থানীয়দের মনে। মাদক, অনলাইন জুয়া ও বাল্যবিয়ের মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার চরম মূল্য দিতে হচ্ছে এই তরুণ শিক্ষককে। ৮ দিন ধরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন তিনি। তার চেতনা এখনও ফেরেনি। ধারালো অস্ত্রের নির্মম আঘাত তা
র মাথাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে, যার ফলে চিকিৎসকরা এখনও কোনো আশার আলো দেখাতে পারছেন না। আরিফুল ইসলাম লালমনিরহাট সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক। তিনি আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী গন্ধমরুয়া এলাকার বাসিন্দা। জানা গেছে, জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের উদ্যোগে গঠিত ‘আলোকিত লালমনিরহাট’ নামক একটি সামাজিক আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। এই আন্দোলনের একজন নিষ্ঠাবান কর্মী হিসেবে তিনি নিজ এলাকায় মাদক ও যুবসমাজকে ধ্বংসকারী অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলেছিলেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আরিফুল ইসলাম এলাকার চিহ্নিত কিছু যুবক, যারা দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন জুয়া ও মাদকের কারবারের সাথে জড়িত, তাদের সতর্ক করেছিলেন। তিনি তাদের এসব পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আহ্বান জানান এবং অন্যথায় আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দেন। এই ঘটনার মূলহোতা দুর্রগাপুর এলাকার গন্ধমরুয়া গ্রামের মতৃ আনোয়ার হোসেনের ছেলে রহিদুল ইসলাম সহ-তার দলবল আরিফুলের সমাজের কল্যাণে নেওয়া এই সাহসী উদ্দ্যাগের জন্য তার ওপর হামলার প্রধান কারণ। বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। গত ১ আগস্ট কলেজ থেকে ফেরার পথে আগে থেকে ওত পেতে থাকা একদল সন্ত্রাসী তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, রহিদুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন এই দলটি ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার মাথায় এলোপাতাড়ি কোপায়। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে লালমনিরহাট এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ আট দিনেও তার অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। এই মর্মান্তিক ঘটনার মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার আরিফুল ইসলামের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। পরিবারের সবচেয়ে আনন্দের দিনটি আজ পরিণত হয়েছে চরম বিষাদে। একদিকে আইসিইউতে বাবার নিথর দেহ, অন্যদিকে হাসপাতালের অন্য বেডে মায়ের কোলজুড়ে আসা ফুটফুটে সন্তান—এই নির্মম দৃশ্য শোকস্তব্ধ করে দিয়েছে পুরো পরিবারকে। নবজাতকটি এখনও জানে না তার বাবা তার মুখ দেখার জন্য আদৌ ফিরবেন কি না। এলাকাবাসীর অভিযোগ, রহিদুল এবং তার সহযোগীদের জুয়া ও মাদক সিন্ডিকেট এলাকায় ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। তাদের পাতা ফাঁদে পড়ে বহু যুবক নিঃস্ব হয়েছেন, অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস পায় না। আরিফুল ইসলাম সাহসী হয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন বলেই তাকে এই নৃশংসতার শিকার হতে হলো। এই ঘটনায় গত ২ আগস্ট আরিফুলের বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক বাদী হয়ে ১০ জনের নাম উল্লেখ করে আদিতমারী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। তবে পরিবারের অভিযোগ, মামলার প্রধান আসামি রহিদুল ইসলাম পলাতক থাকলেও বাকি আসামিরা আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে উল্টো মামলা তুলে নেওয়ার জন্য পরিবারটিকে হুমকি দিচ্ছে। এতে তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এদিকে পুত্রের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, "আমার ছেলে সমাজকে ভালো করার চেষ্টা করেছিল, তার এই শাস্তি কেন? আমরা এখন আসামিদের ভয়ে তটস্থ। আমি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ও ন্যায়বিচার চাই।" সৃষ্ট ঘটনায় আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সাকিব (সজীব) দৈনিক আমার বাংলাদেশ সাংবাদিক কে বলেন, মামলাটি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রধান অভিযুক্ত রহিদুলকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি আশ্বস্ত করেন যে আসামিদের হুমকির বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হবে এবং পরিবারটিকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দেওয়া হবে।

