স্টাফ রিপোর্টার
মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে সেলাইয়ের পর ক্ষতস্থানে পচন, অস্ত্রোপচারে বের হলো বাঁশের দুই টুকরো
কাটা জখম নিয়ে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন অঞ্জনা দত্ত (৪০)। ক্ষতস্থানে সেলাই করে তাঁকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। কিন্তু বাড়িতে ফেরার পর সেই ক্ষতস্থানে পচন ধরার পাশাপাশি তীব্র ব্যথা শুরু হয়। পরে মৌলভীবাজার শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের সময় ক্ষতস্থান থেকে বাঁশের দুটি টুকরো বের করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তাঁর স্বজনেরা। ঘটনাটি নিয়ে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাপদ্ধতি, ক্ষতস্থান পরীক্ষা এবং রোগীকে ছাড়পত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে চিকিৎসাগত
অবহেলা হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা নথি ও চিকিৎসকদের বক্তব্য যাচাই ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। অঞ্জনা দত্ত মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ৭ নম্বর চাঁদনীঘাট ইউনিয়নের মাতারকাপন এলাকার বাসিন্দা। হাসপাতালের রেজিস্ট্রেশন নম্বর ১১৬৪৬৪ অনুযায়ী, গত ১১ সেপ্টেম্বর রক্তাক্ত কাটা জখম নিয়ে তিনি জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান। রোগীর স্বজনদের ভাষ্য, হাসপাতালে তাঁর ক্ষতস্থানে সেলাই করা হয়। ১৪ সেপ্টেম্বর তাঁকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। এরপর তিন দিন পর ড্রেসিং করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল বলেও তাঁরা জানান। তবে বাড়িতে ফেরার পর অঞ্জনা দত্তের অবস্থার উন্নতি হয়নি। বরং সেলাই করা ক্ষতস্থানে পচন দেখা দেয় এবং ব্যথা ক্রমে বাড়তে থাকে। পরে তাঁকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে মৌলভীবাজার শহরের এ্যাপোলো স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক ডা. এস. এম. গোলাম রহমানের তত্ত্বাবধানে তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয়। তিনি সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক এবং অবসরপ্রাপ্ত সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক। রোগীর স্বজনেরা জানান, অস্ত্রোপচারের সময় ক্ষতস্থান থেকে বাঁশের দুটি টুকরো বের করা হয়। বর্তমানে অঞ্জনা দত্ত ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন ঘটনার পর রোগীর স্বজনদের মধ্যে প্রধান প্রশ্ন উঠেছে কাটা জখমের ভেতরে যদি বাঁশের কোনো অংশ থেকে থাকে, তাহলে তা প্রাথমিক চিকিৎসার সময় শনাক্ত করা হয়েছিল কি না। যদি শনাক্ত না হয়ে থাকে, তাহলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণ ছাড়াই ক্ষতস্থান সেলাই করা হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। আরেকটি প্রশ্ন হলো, ১৪ সেপ্টেম্বর রোগীকে ছাড়পত্র দেওয়ার সময় ক্ষতস্থানের অবস্থা কেমন ছিল। হাসপাতালের চিকিৎসা নথিতে এ বিষয়ে কী উল্লেখ রয়েছে এবং পরবর্তী ড্রেসিংয়ের জন্য রোগীকে কী ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল এসব তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিয়ে বড় প্রশ্ন সরকারি হাসপাতাল দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসার প্রধান আশ্রয়। বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষের জন্য এসব হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সেখানে চিকিৎসার কোনো অভিযোগ উঠলে সেটিকে শুধু একজন রোগীর ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; একই সঙ্গে দেখতে হয় সেবাব্যবস্থার কোথাও ঘাটতি ছিল কি না। অঞ্জনা দত্তের ক্ষেত্রে চিকিৎসাগত অবহেলা হয়েছে এমন সিদ্ধান্ত এখনই টানা ঠিক হবে না। কিন্তু একজন রোগীর ক্ষত সেলাই করার পর সেখানে পচন দেখা দেওয়া এবং পরবর্তী অস্ত্রোপচারে ক্ষতস্থান থেকে বাঁশের টুকরো বের হওয়ার দাবি অবশ্যই যথাযথভাবে যাচাই করার মতো বিষয়। চিকিৎসকদের ওপর দায়িত্ব থাকে রোগীর নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার। একইভাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো চিকিৎসাসেবা নিয়ে অভিযোগ উঠলে তা খতিয়ে দেখা এবং প্রয়োজন হলে রোগী ও স্বজনদের কাছে বিষয়টির ব্যাখ্যা দেওয়া। প্রশ্ন তাই শুধু কীভাবে বাঁশের দুটি টুকরো ক্ষতস্থানে রয়ে গেল? প্রশ্ন আরও বড় প্রাথমিক চিকিৎসার সময় কী পরীক্ষা করা হয়েছিল, সেলাইয়ের আগে ক্ষতস্থান যথাযথভাবে দেখা হয়েছিল কি না, এবং রোগীকে ছাড়ার আগে তাঁর অবস্থা কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে চিকিৎসা-নথি, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বক্তব্য এবং প্রয়োজনীয় তদন্তে। এ বিষয়ে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

