স্টাফ রিপোর্টার
নিখোঁজের পর কিশোরী ‘গোপন’ হেফাজতে?
মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দুই দিন ধরে লিমন মিয়া নামে এক যুবকের সঙ্গে থাকার পর কিশোরীকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে না দিয়ে তার চাচা সাজন মিয়া একটি গোপন স্থানে রেখেছেন। এমনকি কিশোরীর মোবাইল ফোনও চাচার কাছে আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—১৫ বছর বয়সী কিশোরীটি বর্তমানে কোথায়, কার হেফাজতে এবং সে নিরাপদে আছে কি না? স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিশোরী দুই দিন লিমন মিয়া
র সঙ্গে থাকার পর বিষয়টি পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের মধ্যে জানাজানি হয়। এরপর তাকে উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও অভিযোগ রয়েছে, চাচা সাজন মিয়া বিষয়টি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন এবং কিশোরীকে অন্যত্র রাখেন। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, লিমন মিয়ার কাছ থেকে সাজন মিয়া অর্থ নিয়ে ঘটনাটি মীমাংসার নামে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে এই অর্থ লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সাজন মিয়া এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি বিষয়টি জানেন না। লিমন মিয়ার বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদন প্রকাশের ১২ ঘণ্টার মধ্যেই উধাও! ঘটনাটিকে আরও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত আগের একটি প্রতিবেদন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, হাবিবুর রহমান নাজমুল নামের এক ব্যক্তি কিশোরীকে ঘিরে ধর্ষণের অভিযোগসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন তার ফেসবুক আইডিতে প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু প্রকাশের প্রায় ১২ ঘণ্টার মধ্যে সেটি সরিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—কোন তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছিল? আর প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটি সরিয়ে নেওয়ার কারণ কী? প্রতিবেদনটি ভুল তথ্যের ভিত্তিতে হয়ে থাকলে সংশোধনী বা ব্যাখ্যা প্রকাশের সুযোগ ছিল। আবার তথ্য সঠিক হয়ে থাকলে সেটি সরিয়ে ফেলার কারণও পাঠকের জানার অধিকার রয়েছে। কোনো চাপ, ভুল তথ্য, আইনি জটিলতা, পারিবারিক সমঝোতা কিংবা অন্য কোনো কারণে প্রতিবেদনটি সরানো হয়েছে কি না—তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। অর্থের বিনিময়ে প্রতিবেদন সরিয়ে ফেলার কোনো অভিযোগ থাকলে সেটিও তদন্ত ও প্রমাণের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। কারণ প্রমাণ ছাড়া কাউকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করা যেমন অনুচিত, তেমনি গুরুতর অভিযোগসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন হঠাৎ সরিয়ে ফেলার ঘটনাও ব্যাখ্যাহীন থাকার সুযোগ নেই। সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে তথ্যের সত্যতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর। তাই প্রকাশিত একটি গুরুতর প্রতিবেদনের পর সেটি মুছে ফেলার কারণ জানানো না হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়—সংবাদটি কেন প্রকাশ করা হয়েছিল, আবার কেন সরিয়ে নেওয়া হলো? কেন্দ্রে কিশোরীর নিরাপত্তা তবে এসব বিতর্কের ঊর্ধ্বে রয়েছে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীর নিরাপত্তার বিষয়টি। কিশোরী কীভাবে ওই যুবকের সঙ্গে ছিলেন, স্বেচ্ছায় নাকি অন্য কোনো পরিস্থিতিতে সেখানে গিয়েছিলেন, তাকে জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছিল কি না, কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না—এসব বিষয় অনুমাননির্ভরভাবে নয়, তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একইভাবে বর্তমানে তাকে কার হেফাজতে রাখা হয়েছে, কেন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না এবং তার মোবাইল ফোন কেন আটকে রাখা হয়েছে—এসব প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন। রাজনগর থানার এসআই আমির হোসেন বলেন, এ ঘটনায় লিমা বেগম থানায় একটি অভিযোগ দিয়েছেন। এখন প্রয়োজন অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বাইরে গিয়ে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত। কিশোরীকে নিরাপদে উদ্ধার বা তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনসম্মত পদ্ধতিতে তার বক্তব্য গ্রহণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ থাকলে তা যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে হাবিবুর রহমান নাজমুলের প্রকাশিত প্রতিবেদন কেন সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়েও তার বক্তব্য জানা প্রয়োজন। প্রতিবেদনটি মুছে ফেলার পেছনে যদি কোনো নির্দিষ্ট কারণ থাকে, তা প্রকাশ্যে এলে ঘটনাটি নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নের অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে। সবশেষে প্রশ্ন একটাই—একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীর নিরাপত্তা ও সত্য উদ্ঘাটনের বিষয়টি কি কোনো পারিবারিক সমঝোতা, প্রভাব কিংবা অস্বচ্ছতার আড়ালে চাপা পড়ে যাবে? নাকি তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে প্রকৃত ঘটনা?

