মৌলভীবাজার কুলাউড়া প্রতিনিধি
কোন দলে, কাকে ভোট? কুলাউড়া মডেল মসজিদের ইমাম নিয়োগে রাজনৈতিক প্রশ্নের অভিযোগ
মসজিদের ইমাম নিয়োগ—যেখানে প্রার্থীর ধর্মীয় জ্ঞান, যোগ্যতা, কোরআন-হাদিসের জ্ঞান ও ইমামতির সক্ষমতাই হওয়ার কথা মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড। কিন্তু মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা মডেল মসজিদের ইমাম নিয়োগের ভাইভা পরীক্ষা ঘিরে উঠেছে ভিন্ন এক অভিযোগ। প্রার্থীদের দাবি, ধর্মীয় ও একাডেমিক যোগ্যতার পাশাপাশি তাদের রাজনৈতিক পরিচয়, কোন দল করেন এবং কাকে ভোট দিয়েছেন—এমন প্রশ্নও করা হয়েছে। গত ২২ আগস্ট লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের ভাইভা অনুষ্ঠিত হয় কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে। ভাইভা বো
র্ডে মৌলভীবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম শকু পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছেন ইউএনও। তবে কয়েকজন প্রার্থীর অভিযোগ, ভাইভায় রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের। আমি কোন দলে ভোট দিয়েছি সেটাই জানতে চাওয়া হয়’ ভাইভায় অংশ নেওয়া শামসুল ইসলামের দাবি, তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করা হয় তিনি কোন দলে ভোট দিয়েছেন এবং কোন দলের রাজনীতি করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার কথা জানান। একই সঙ্গে তালামিজ করেন কি না জানতে চাওয়া হলে তিনি ‘তালামিজ করি’ বলে উত্তর দেন। আরেক প্রার্থী মো. শওকতুল ইসলামের দাবি, তাকে কয়েক মিনিট ধরে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। তার ভাষ্য, ভাইভা বোর্ডকে উদ্দেশ করে সংসদ সদস্য বলেন—‘বিগত নির্বাচনে উনার শক্ত ভূমিকা ছিল।’ তবে ওই প্রার্থী নিজেকে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন বলে জানান। জুবায়ের আহমদের দাবি, তাকে প্রশ্ন করা হয়—মসজিদের ইমামদের রাজনীতি করা জায়েজ কি না। এরপর তার আর কোনো ভাইভা নেওয়া হয়নি বলে তিনি জানান। মো. মুকিত খানের অভিযোগ, তাকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয় তিনি কতদিন ধরে তালামিজ করেন। তার দাবি, এরপর আর কোনো প্রশ্ন করা হয়নি। অন্যদিকে মো. ছালিক উদ্দিনের অভিযোগ, তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং ভাইভায় বোর্ডের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পরও বিষয়টি অন্যদিকে নেওয়া হয়েছে। নিয়োগ পাওয়া প্রার্থীকে ঘিরে স্বজনপ্রীতির প্রশ্ন ইমাম হিসেবে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত মো. মাইদুল ইসলামের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন প্রার্থী। তাদের অভিযোগ, ভাইভা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পছন্দের প্রার্থীকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। প্রার্থী আমিনুল ইসলামের দাবি, ভাইভা থেকে বের হওয়ার পর মাইদুল ইসলাম নিজেই তাকে জানিয়েছিলেন যে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর তিনি দিতে পারেননি এবং তার ভাইভা ভালো হয়নি। তবে শেষ পর্যন্ত তিনিই নির্বাচিত হন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নির্বাচিত ইমাম মো. মাইদুল ইসলাম। তার দাবি, ভাইভা বোর্ডের পরীক্ষকদের প্রশ্নের উত্তর তিনি দিয়েছেন এবং সংসদ সদস্য তাকে শুধু রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে কি না এমন প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন বলে উত্তর দিয়েছেন। তবে মাইদুল ইসলাম স্বীকার করেছেন, ভাইভা বোর্ডের সদস্য মাওলানা মাহমুদুর রহমান ইমরানকে তিনি চেনেন। তিনি বলেন, তিনি একসময় জমিয়তের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং জমিয়তের মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন। ছাত্রজীবনে ছাত্র জমিয়তের সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন বলে জানান। তবে ইমাম নিয়োগের জন্য তিনি কোনো তদবির করেননি বলেও দাবি করেন। উল্লেখ্য, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ বিএনপির সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক জোটে রয়েছে। বিতর্কিত হয়ে গেছে, কোনো মন্তব্য করতে চাই না’ ভাইভা বোর্ডের সদস্য মাওলানা মাহমুদুর রহমান ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বিষয়টি বিতর্কিত হয়ে গেছে; এ বিষয়ে ইউএনও ও সংসদ সদস্যের সঙ্গে কথা বলতে। তবে মাইদুল ইসলামকে চেনেন না এমন দাবিও করেন তিনি। সাংবাদিককে ফোন বিএনপি নেতার, ‘বেশি ছানাছানি করার দরকার নাই’ অনুসন্ধানের সময় আরও একটি বিষয় সামনে আসে। ভাইভা বোর্ডের সদস্যের সঙ্গে কথা বলার কিছুক্ষণ পর কুলাউড়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সজল প্রতিবেদককে ফোন করেন। তিনি জানতে চান, নিয়োগ পাওয়া ইমামের বিষয়ে প্রতিবেদকের সংশ্লিষ্টতা কী এবং প্রশ্ন করেন আপনি সাংবাদিক, নাকি এনএসআই, নাকি ডিজিএফআই? পরবর্তীতে ওই নেতা জানান, ভাইভা বোর্ডের সদস্য মাওলানা মাহমুদুর রহমান ইমরান তাকে ফোন করে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে বলেছিলেন। তার দাবি, স্থানীয় হিসেবে তিনি শুধু কে ফোন করে প্রশ্ন করছেন তা জানার জন্যই প্রতিবেদককে ফোন করেছিলেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি বিষয়টি আর না বাড়ানোর অনুরোধ করে বলেন এটা নিয়ে বেশি ছানাছানি করার দরকার নাই। এই ফোনালাপও ইমাম নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নকে আরও আলোচনায় এনেছে। এমপির বক্তব্য পাওয়া যায়নি অভিযোগের বিষয়ে মৌলভীবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম শকুর বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হয়। একপর্যায়ে তিনি ফোন রিসিভ করে ‘পার্লামেন্টে আছি’ বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর সাড়া দেননি। তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বার্তা পাঠিয়েও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে প্রার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্যের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। ইউএনও: দল বা ভোট নিয়ে প্রশ্ন করা অবৈধ কুলাউড়া উপজেলা মডেল মসজিদের ইমাম নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা আক্তার বলেন, ইমাম নিয়োগ নিয়ে বিতর্কের বিষয়টি তারা ইতোমধ্যে জেনেছেন। তার ভাষ্য, সংসদ সদস্য পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এবং তখন কিছু প্রশ্ন করা হয়। তবে নিয়োগ বোর্ডের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দল বা ভোটের বিষয়ে প্রশ্ন করার কোনো নির্দেশনা ছিল না। তিনি বলেন নিয়োগ প্রক্রিয়া শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গেই সম্পন্ন হয়েছে। তবে কোন দলে ভোট দিয়েছেন বা ‘কাকে ভোট দিয়েছেন এ ধরনের প্রশ্ন করা যায় কি না জানতে চাইলে ইউএনও স্পষ্টভাবে বলেন, ‘না, এমন প্রশ্ন করা যায় না, এগুলো অবৈধ। প্রশ্ন এখন একটাই একটি মডেল মসজিদের ইমাম নিয়োগে প্রার্থীর যোগ্যতা নির্ধারণের মানদণ্ড কী হবে ধর্মীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও মেধা, নাকি রাজনৈতিক পরিচয়? প্রার্থীদের অভিযোগ সত্য হলে, বিষয়টি শুধু একটি নিয়োগ পরীক্ষার অনিয়মের অভিযোগ নয়; বরং সরকারি মসজিদের ইমাম নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব ও নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। অন্যদিকে নিয়োগ কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ছিল এবং বোর্ডের পক্ষ থেকে এমন কোনো রাজনৈতিক প্রশ্ন করা হয়নি। তাই অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের বাইরে এখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত ও ভাইভা প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ যাচাই। কারণ মসজিদের ইমাম নিয়োগে প্রার্থীর ভোটের পছন্দ নয় তার ইলম, আমল, যোগ্যতা ও চরিত্রই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় বিবেচনা।

