নবীগঞ্জ /হবিগঞ্জ প্রতিনিধি
ঐতিহ্যের আড়ালে অনিয়মের আশ্রয়? ‘হবিগঞ্জ এক্সপ্রেস’ নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে খোদ হবিগঞ্জবাসী
ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে কি ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও সড়কে বেপরোয়া চলাচলকে বৈধতা দেওয়া যায়? সম্প্রতি হবিগঞ্জ এক্সপ্রেস’ বা স্থানীয়ভাবে পরিচিত হবিগঞ্জ বিরতিহীন’ পরিবহনকে ঘিরে সিলেট বিভাগের পরিবহন অঙ্গনে আলোচিত প্রশ্ন এটি। দীর্ঘদিনের অভিযোগ, অনিয়ম এবং যাত্রী অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে মৌলভীবাজার জেলার উপর দিয়ে এই পরিবহনের চলাচল বন্ধ হওয়ার পর এখন নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ঘোষিত ধর্মঘট কর্মসূচি। জানা গেছে, ফিটনেস, রুট পারমিট ও অন্যান্য আইনগত জটিলতার অভিযোগে গত ১০ মে থেকে মৌলভীবাজার জেলার ওপর দিয়ে ‘হ
বিগঞ্জ এক্সপ্রেস’-এর চলাচল বন্ধ করে দেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রশাসনের দাবি, যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে পরিবহন মালিকপক্ষ এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে আগামী ৩ জুন থেকে সর্বাত্মক ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। তাদের দাবি, এটি ৫২ বছরের পুরোনো একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবহন রুট, যা হঠাৎ করে বন্ধ করে দেওয়া উচিত হয়নি। কিন্তু ধর্মঘটের ডাকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, তা মালিকপক্ষের প্রত্যাশার সঙ্গে একেবারেই মিলছে না। বরং খোদ হবিগঞ্জের সাধারণ মানুষই এই পরিবহন সার্ভিসের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। হবিগঞ্জের জনপ্রিয় অনলাইন সংবাদমাধ্যম দিনরাত নিউজ-এর ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি সংবাদে পাঠকদের শতাধিক মন্তব্যে উঠে এসেছে যাত্রীদের অভিজ্ঞতা, অভিযোগ ও ক্ষোভ। আসাদ আহমেদ নামের এক পাঠক লিখেছেন, হবিগঞ্জ বাস বন্ধ থাকলে কোনো অসুবিধা নেই ইনশাআল্লাহ। সিলেট যেতে হলে এনা, আল মোবারক, হানিফসহ আরও অনেক বাস আছে, যাইতে পারবো। রশিদ তালুকদার আরও কঠোর ভাষায় মন্তব্য করেন, চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাক। আমাদের যাতায়াতের জন্য অনেক পরিবহন আছে। অন্যদিকে সুমন দাস বাসের স্টাফদের আচরণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, সিলেট রোডে এনা পরিবহন চালু করা হোক অথবা বিআরটিসি পুনরায় চালু করা হোক। বিরতিহীন ফালতু পরিবহন, স্টাফগুলো এক একটা খাটাস। মুফাজ্জল হোসেন এবং আলাউদ্দিন আজাদ কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে মন্তব্য করেন, জনগণ পাশে নাই, আগে ব্যবহার ভালো করেন। একটা মানুষও তো ভালো কমেন্ট করে না। এইটা দেইখা শিক্ষা নেওয়া দরকার আছিল।" একই সুরে শেখ আবু তাহের ও আমিনুল ইসলাম লিখেছেন, "এই বাস বন্ধ হয়ে গেলে জনগণ উপকৃত হবে। বিরতিহীন বাস নিষিদ্ধ চাই।" শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, সাধারণ যাত্রীদের মধ্যেও বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থার দাবি জোরালো হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তারকারী পরিবহন সিন্ডিকেটের কারণে যাত্রীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাদের দাবি, সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি পুনরায় শক্তিশালীভাবে এই রুটে চালু করা হোক। পাশাপাশি এনা পরিবহন, আল মোবারক পরিবহন এবং হানিফ এন্টারপ্রাইজ-এর মতো সেবামুখী পরিবহনের সংখ্যা বাড়ানো হোক, যাতে যাত্রীরা নিরাপদ ও মানসম্মত সেবা পেতে পারেন। পরিবহন সংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিচয় তার বয়সে নয়, বরং তার সেবার মানে। ৫২ বছর ধরে ব্যবসা করার অর্থ এই নয় যে, আইন অমান্য করা কিংবা যাত্রী নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলার সুযোগ তৈরি হবে। বিশ্লেষকদের ভাষায়, বর্তমানে সাধারণ মানুষের চাহিদা বদলে গেছে। মানুষ এখন শুধু গন্তব্যে পৌঁছাতে চায় না, নিরাপদে পৌঁছাতে চায়। তারা এমন পরিবহন চায়, যেখানে থাকবে বৈধ কাগজপত্র, ফিটনেস সনদ, দক্ষ চালক এবং যাত্রীদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ। মৌলভীবাজার প্রশাসনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে অনেকেই সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখছেন। তাদের মতে, জননিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই। ঐতিহ্য, ব্যবসায়িক স্বার্থ কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব—কোনোটিই মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না। ৩ জুনের ঘোষিত ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং জনমতের বর্তমান চিত্র একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—ধর্মঘটের মাধ্যমে মানুষকে জিম্মি করার কৌশল এখন আর আগের মতো কার্যকর নয়। কারণ জনগণের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যেই নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছে। তাদের ভাষায়, “ধর্মঘট নয়, নিরাপদ সড়ক চাই; ঐতিহ্য নয়, মানুষের জীবনের মূল্যই সবার আগে।”

