স্টাফ রিপোর্টার
২০০ কোটি টাকার কয়েন’ ঘিরে প্রতারণার ফাঁদ
একটি কথিত মূল্যবান ধাতব বস্তু তার মূল্য নাকি হাজার কোটি টাকা। সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নাম, কথিত বিশেষজ্ঞের পরীক্ষা, ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, চা-বাগানের মালিকপক্ষ সব মিলিয়ে তৈরি করা হয়েছিল বড় ধরনের একটি ব্যবসায়িক লেনদেনের আবহ। আর সেই বিশ্বাসের ফাঁদে পড়ে এক ব্যবসায়ী ও তাঁর প্রবাসী মামাতো ভাইয়ের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ২ কোটি ২১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে। অভিযোগের ঘটনাপ্রবাহ আরও চাঞ্চল্যকর। কথিত মূল্যবান বস্তুটি একটি বক্সে কর
ে ভুক্তভোগীদের হাতে তুলে দেওয়ার পর সেটি খুলে পাওয়া যায় একটি সাপ। তখন প্রতারকরা দাবি করে টাকার বিরোধের কারণে কথিত ‘আইটেম’টি জিনের মাধ্যমে সাপে পরিণত হয়েছে এবং ২১ দিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে! এ ঘটনায় মৌলভীবাজার জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) অভিযান চালিয়ে রাজনগর উপজেলার সাবেক ইউপি সদস্য এস.এম. ইলিয়াছুর রহমানসহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতার অন্য তিনজন হলেন—শ্রীমঙ্গলের উত্তর ভাড়াউড়া গ্রামের মো. ইকরাম মিয়া, ঢাকার মোহাম্মদপুরের শ্যামলী এলাকার তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামান এবং মোহাম্মদিয়া হাউজিং এলাকার মো. ইব্রাহিম বেপারী। পুলিশের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চক্রটি কথিত প্রাচীন কয়েন, সীমানা পিলার ও মূল্যবান ধাতব বস্তু ক্রয়-বিক্রয়ের নামে মানুষের কাছে বিপুল মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে আসছিল। নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তারা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন নামিদামি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশের প্রতিনিধি পরিচয় ব্যবহার করত বলেও জানিয়েছে পুলিশ। ‘হাজার কোটি টাকার’ বস্তুর গল্প মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, রাজনগরের বালিসহস্র গ্রামের ব্যবসায়ী আব্দুর রহিমের সঙ্গে পূর্বপরিচিত ছিলেন সাবেক ইউপি সদস্য ইলিয়াছুর রহমান। তাঁর মাধ্যমে আব্দুর রহিমের পরিচয় হয় কথিত মূল্যবান ধাতব বস্তু ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের। তাঁকে বলা হয়, চাতলাপুর চা-বাগানের কয়েকজনের কাছে ব্রিটিশ আমলের একটি মূল্যবান ধাতব বস্তু রয়েছে, যার মূল্য হাজার কোটি টাকারও বেশি। ঢাকার একটি পক্ষ সেটি কিনতে আগ্রহী। মধ্যস্থতা করে লেনদেন সম্পন্ন করাতে পারলে বিপুল অর্থ লাভের সুযোগ রয়েছে। প্রথমে বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হলেও ইলিয়াছুরের বারবার আশ্বস্ত করায় আব্দুর রহিম বিষয়টি যাচাইয়ে আগ্রহী হন। পরে তাঁর আমেরিকাপ্রবাসী মামাতো ভাই মির্জা খালেদুর রহমানকেও এতে যুক্ত করা হয়। এরপর চক্রের সদস্যরা কথিত ক্রেতা, বিশেষজ্ঞ ও চা-বাগানসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সামনে এনে পুরো বিষয়টিকে একটি বৈধ ও বড় ব্যবসায়িক লেনদেন হিসেবে উপস্থাপন করে বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘বিশেষজ্ঞের পরীক্ষা’ থেকে শুরু বিশ্বাসের ফাঁদ অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৯ আগস্ট কথিত একজন বিশেষজ্ঞকে সঙ্গে নিয়ে চাতলাপুর চা-বাগানে যান আব্দুর রহিম। সেখানে কথিত বিশেষজ্ঞ বস্তুটি পরীক্ষা করে সেটিকে মূল্যবান ও আসল বলে জানায়। এরপর কথিত ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য বাগানীদের অর্থ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে জানিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অর্থ ও স্বাক্ষরিত চেক নেওয়া শুরু হয়। একপর্যায়ে ১ কোটি টাকা দেওয়ার কথা বলে আব্দুর রহিমের মামাতো ভাইয়ের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা করে চারটি স্বাক্ষরিত চেক নেওয়া হয় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। এরপর আসে ২৭ অক্টোবর ২০২৩। কথিত মূল্যবান বস্তুটি ঢাকার ক্রেতার কাছে হস্তান্তরের কথা বলে ভুক্তভোগী, তাঁর মামাতো ভাই, কথিত ক্রেতা প্রতিনিধি ও কথিত বিশেষজ্ঞকে চাতলাপুর চা-বাগানে নেওয়া হয়। সেখানে বস্তুটি আবারও পরীক্ষা করা হয়। কথিত বিশেষজ্ঞ সেটিকে সঠিক বলে নিশ্চিত করার পর একটি বক্সে করে বস্তুটি ভুক্তভোগীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিনিময়ে নেওয়া হয় নগদ ২ কোটি টাকা। পাশাপাশি আরও দেড় কোটি টাকা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাদের কাছে বস্তুটি রেখে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। কিন্তু বক্স খুলতেই পাল্টে যায় পুরো দৃশ্য। ভেতরে মূল্যবান ধাতব বস্তু নয় ছিল একটি সাপ। ‘জিনের কারণে সাপ হয়েছে তারপরও থামেনি প্রতারণা বক্সের ভেতর সাপ পাওয়ার পর ভুক্তভোগীরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে নানা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, একপর্যায়ে চক্রের একজন দাবি করে টাকা নিয়ে বিরোধের কারণে কথিত ‘আইটেম’টি জিনের মাধ্যমে সাপে পরিণত হয়েছে; ২১ দিন পর সেটি আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে। এই ব্যাখ্যাতেও শেষ হয়নি বিষয়টি। বরং সময়ক্ষেপণের পাশাপাশি পরবর্তীতে আরও একটি মূল্যবান বস্তু পাওয়ার কথা জানিয়ে নতুন করে অর্থের প্রয়োজনের কথা বলা হয়। পূর্বের টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় এবং নতুন কথিত বস্তুর ব্যবসার প্রত্যাশায় ভুক্তভোগী আরও ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। শেষ পর্যন্ত কথিত মূল্যবান বস্তু কিংবা দেওয়া অর্থ কোনোটিই ফেরত পাননি তিনি। যোগাযোগের চেষ্টা করলে কারও মোবাইল বন্ধ, আবার কেউ নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে বলে অভিযোগ। ভুক্তভোগীর দাবি, বিভিন্ন সময়ে এভাবে তাঁর কাছ থেকে প্রায় ২ কোটি ২১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় ২০২৪ সালে কুলাউড়া থানায় মামলা করা হয়। অভিযানে যা মিলল মামলার তদন্তের ধারাবাহিকতায় মৌলভীবাজার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) নোবেল চাকমা ও ডিবির অফিসার ইনচার্জ সুদীপ্ত শেখর ভট্টাচার্যের দিকনির্দেশনায় এসআই আহলাদ ইবনে জামিল, পিপিএমের নেতৃত্বে অভিযান চালায় ডিবি। শ্রীমঙ্গল থেকে ইলিয়াছুর রহমান ও ইকরাম মিয়া এবং ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামান ও ইব্রাহিম বেপারীকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযানে পুলিশ কথিত ২০০ কোটি টাকা মূল্যের একটি ‘এন্টিক পাওয়ার কয়েন’, একটি নোহা গাড়ি, পকেট রাউটার, আটটি মোবাইল ফোন, বিভিন্ন নামে ৫০০টি ভিজিটিং কার্ড, ৯৪ পাতা কথিত বিজনেস এগ্রিমেন্ট, তিনটি চেকবই, একটি কয়েন ব্ল্যাংক অ্যালবাম, ডায়েরি, ১০টি সিমকার্ড, ছয়টি কথিত ভুয়া স্ট্যাম্প এবং ‘এন্টিক গ্যালারি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’-এর নামে একটি কথিত ভুয়া সার্টিফিকেট জব্দ করেছে বলে জানিয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, চক্রের সদস্যরা বিশ্বের বিভিন্ন নামিদামি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশের প্রতিনিধি পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা করত। গ্রেফতার তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামানসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালেও ঢাকা ডিবিতে একই ধরনের প্রতারণার অভিযোগে মামলা ও গ্রেফতারের তথ্য পাওয়া গেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। অস্বাভাবিক লাভের লোভ প্রতারণার বড় অস্ত্র একটি কথিত প্রাচীন বস্তু, কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নাম, একজন ‘বিশেষজ্ঞ’ এবং অস্বাভাবিক মুনাফার প্রতিশ্রুতি এই চারটি উপাদানকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছিল বিশ্বাসের পরিবেশ। অভিযোগ অনুযায়ী, সেই বিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় কোটি টাকার প্রতারণায়। তদন্তে গ্রেফতার ব্যক্তিদের সঙ্গে আর কারা জড়িত, কথিত ‘ক্রেতা’, ‘বিশেষজ্ঞ’ ও বাগানসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় কতটা সত্য, জব্দ করা কথিত ২০০ কোটি টাকার কয়েনের প্রকৃত পরিচয় কী এবং এ ধরনের প্রতারণার সঙ্গে আরও কোনো ভুক্তভোগী রয়েছেন কি ন এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে অস্বাভাবিক মুনাফার প্রলোভনে পড়ে প্রাচীন কয়েন, সীমানা পিলার বা কথিত মূল্যবান ধাতব বস্তু কেনাবেচায় অর্থ বিনিয়োগ না করার এবং যাচাই ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে বিশ্বাস না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে গ্রেফতার ব্যক্তিরা আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

