মাতারবাড়ী, কক্সবাজার প্রতিনিধি:
মাতারবাড়ীকে ঘিরে বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও গভীর সমুদ্রবন্দরের সমন্বিত উন্নয়নের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং বৃহৎ অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ও কার্যকর ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে অবস্থিত ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন মাতারবাড়ী আল্ট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনকালে তিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর ও সংশ্লিষ্ট শিল্প অবকাঠামোর সমন্বিত উন্নয়নের ওপর জোর দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের
পাশাপাশি জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা জরুরি। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বৃহৎ অবকাঠামো পরিচালনার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সক্ষমতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন তিনি। সফরসূচি অনুযায়ী, গতকাল রবিবার (৯ আগস্ট ২০২৬) সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে হেলিকপ্টারযোগে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের হেলিপ্যাডে অবতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি প্রকল্পের প্রশাসনিক ভবনে যান। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত তিনি প্রকল্পের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত ব্রিফিং গ্রহণ করেন। ব্রিফিংয়ে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্তমান অবস্থা, উৎপাদন ও পরিচালন কার্যক্রম, উৎপাদন সক্ষমতা, জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা, প্ল্যান্ট পরিচালনার দক্ষতা, রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। একই সঙ্গে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও তাঁর সামনে তুলে ধরা হয়। দেশীয় প্রকৌশলীদের দক্ষতায় সন্তোষ ব্রিফিংয়ের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী জানতে পারেন, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রটি শতভাগ দেশীয় প্রকৌশলী ও জনবল দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এতে সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। দেশীয় প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দক্ষতা ও সক্ষমতার প্রশংসা করে তাঁদের উৎসাহিত করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রকল্প এলাকায় এ সময় তিনি একটি স্মারক নিমগাছের চারা রোপণ করেন। দুটি ৬০০ মেগাওয়াট ইউনিট নিয়ে গঠিত মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। আধুনিক আল্ট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে নির্মিত এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে কয়লা পরিবহনের জন্য বন্দর সুবিধা, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, অ্যাকসেস রোডসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ঋণ সহায়তা দিয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ ও নতুন জ্বালানি প্রকল্পের সম্ভাবনা দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে ব্রিফিং শেষে প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শনে বের হন। দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে তিনি প্রস্তাবিত ৭০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের স্থান পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং ১২টা ২৯ মিনিটে সেখানে পৌঁছান। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ সময় প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা, বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ও সম্ভাব্য উৎপাদন সক্ষমতা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। একই এলাকায় তাঁকে প্রস্তাবিত এলএনজি-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোকেমিক্যাল প্রকল্প এবং নতুন রিফাইনারি স্থাপনের জন্য নির্ধারিত স্থানও দেখানো হয়। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী এলপিজি, এলএনজি ও কয়লা টার্মিনাল-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো এবং প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। এসব প্রকল্পের পরিকল্পনা, সম্ভাব্য ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য নেন। এ সময় বিভিন্ন বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট মতামত ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন। গভীর সমুদ্রবন্দর ঘিরে সমন্বিত পরিকল্পনা মাতারবাড়ী সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল কোল জেটি পরিদর্শন। সেখানে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন স্থাপনা পর্যবেক্ষণ করেন। কয়লা পরিবহন ও খালাসের জন্য প্রয়োজনীয় বন্দর অবকাঠামো এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে এসব স্থাপনার সমন্বিত কার্যক্রম সম্পর্কেও তাঁকে বিস্তারিত অবহিত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাবিত অস্থায়ী এলপিজি জেটি এবং ভবিষ্যতে ৩ ও ৪ নম্বর কোল পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য নির্ধারিত স্থানও পরিদর্শন করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব প্রকল্পের সম্ভাব্য পরিকল্পনা, অবকাঠামোগত প্রস্তুতি ও ভবিষ্যৎ কার্যক্রম সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তথ্য তুলে ধরেন। জ্বালানি নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার তাগিদ পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ও দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। পাশাপাশি প্রকল্প পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত জ্বালানি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন ও শিল্পায়নের সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, একই সঙ্গে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য, সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিকভাবে টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বৃহৎ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নেওয়ার পাশাপাশি জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং সংশ্লিষ্ট শিল্প অবকাঠামোর সমন্বিত উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এসব অবকাঠামোর পরিকল্পিত ও কার্যকর ব্যবহার দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি শিল্পায়ন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মাতারবাড়ী প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য দেশের স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করা। বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি কয়লা পরিবহনের বন্দর, সঞ্চালন লাইন, অ্যাকসেস রোডসহ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো এ বৃহৎ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যারা ছিলেন পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসুল ইসলাম, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, বিশেষ রাজনৈতিক সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মৃধাসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন শেষ করেন। পরে তিনি হেলিপ্যাডের উদ্দেশ্যে রওনা হন। দুপুর ১টা ৫ মিনিটে হেলিকপ্টারযোগে মাতারবাড়ী ত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর এই পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে মাতারবাড়ীকে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্পায়ন ও ভবিষ্যৎ জ্বালানি অবকাঠামোর একটি সমন্বিত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাকে আরও গুরুত্ব দেওয়া হলো।

