স্টাফ রিপোর্টার
মৌলভীবাজারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্ধশত কোটি টাকার জমি বেদখলে!
একদিকে জরাজীর্ণ ভবনে পাঠদান, অন্যদিকে শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্ধশত কোটি টাকা মূল্যের জমি দীর্ঘদিন ধরে বেদখলে থাকার অভিযোগ। মৌলভীবাজারের ঐতিহ্যবাহী কাশিনাথ আলাউদ্দিন হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৫৬ শতক জমি ঘিরে এমনই চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জমিটিতে রয়েছে ২৫-২৬টি দোকানকোঠা। প্রতিষ্ঠানের দাবি, ১৯৭৫ সালে চুক্তিভিত্তিক সাময়িক ভাড়া দেওয়া হলেও দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ ভাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ ওই জমিতে থাকা দোকানকোঠাগুলো থেকে দখলে থাকা ব্যক্তিরা নিয়মিত ভাড়া আদায় করছেন
বলে অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল্যবান সম্পত্তি বছরের পর বছর এভাবে ব্যবহৃত হলেও কেন জমি উদ্ধার হচ্ছে না এ প্রশ্নে স্থানীয় শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সচেতন মহলে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। তাঁদের দাবি, জমির প্রকৃত মালিকানা, চুক্তির বৈধতা, ভাড়া আদায় এবং দখলের বর্তমান অবস্থা তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে জমি উদ্ধার করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের কল্যাণে সম্পদটি কাজে লাগানোর দাবি উঠেছে। ১৯৭৫ সালের চুক্তি, ৫০ বছরেও নিষ্পত্তি নেই প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালে পতিত জমিতে স্থাপনা নির্মাণের শর্তে ২১ জনের কাছে জনপ্রতি পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে চুক্তিভিত্তিক ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তী সময়ে চুক্তির শর্ত উপেক্ষা করে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে একাধিকবার হাতবদল হয়েছে। বর্তমানে মূল চুক্তির বাইরে অন্য ব্যক্তিরা জমি ও দোকানকোঠার দখলে রয়েছেন বলেও দাবি প্রতিষ্ঠানের। দখলে থাকা ব্যক্তিদের কেউ কেউ জমিটি লিজ নেওয়ার দাবি করলেও তাঁদের পক্ষ থেকে লিজসংক্রান্ত প্রমাণ দেখানো যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে জমির বর্তমান দখল, লিজের বৈধতা এবং চুক্তির শর্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র ও সরকারি নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে এসব দাবির সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন সামান্য ভাড়ার বিপরীতে হাজার টাকার বাণিজ্য! সরেজমিনে দোকানভাড়াটিয়াদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা মাসে প্রায় ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা ভাড়া দিয়ে থাকেন। বিপরীতে দখলে থাকা ব্যক্তিদের মাসে সাড়ে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ভাড়াটিয়াদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছর ধরে তাঁরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কোনো ভাড়া দিচ্ছেন না। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, নামমাত্র ভাড়া নির্ধারণ করা হলেও তা নিয়মিত পরিশোধ করা হচ্ছে না। কোথাও কোথাও বছরের পর বছর বকেয়া পড়ে রয়েছে। অন্যদিকে, দোকানকোঠা থেকে ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে দখলে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি থেকে আয় কার হাতে যাচ্ছে এবং প্রতিষ্ঠান কেন তার ন্যায্য আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে না এ প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রতিষ্ঠানের জমিতে থাকা দোকানকোঠাগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য ও ভাড়া আয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নির্ধারণে স্বাধীনভাবে দলিল, চুক্তিপত্র, ভাড়ার রসিদ এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। প্রভাবশালীদের দখল, নীরব কেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ? প্রতিষ্ঠান সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জমি দখলে থাকা ব্যক্তিদের তালিকায় রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের নাম রয়েছে। তালিকায় আবুল কালাম, নজিবুর রহমান চৌধুরী, হানিফ মো. রাজু, মাহবুবুর রহমান, সৈয়দ মানিক, তজমুল হোসেন, আকিল আহমদ, আয়েশা খানম, শাহাজান, সোহেল আহমদ, জুয়েল আহমদ, আব্দুল আহাদ, সায়েক আহমদ, মাসুক মিয়া, কফিল উদ্দিন, মুহিবুর রহমান, টিপু সুলতান, রোকেয়া লস্কর, নুরুল আলম, বশির আহমেদ ও মুজিবুর রহমান বাচ্চুসহ অন্যদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান সূত্রের এ তালিকায় নাম থাকা মানেই কারও বিরুদ্ধে অবৈধ দখলের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের বক্তব্য, বৈধ কাগজপত্র এবং জমির দখলসংক্রান্ত নথি যাচাই করে প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা জরুরি। এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। টিনের ঘরে পাঠদান, অথচ সম্পদ পড়ে আছে অনিয়মের প্রশ্নে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তাঁদের জরাজীর্ণ ও টিনের ঘরে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার সংকটের মধ্যে অনেক অসচ্ছল শিক্ষার্থীর লেখাপড়াও ব্যাহত হচ্ছে। তাঁদের প্রশ্ন, প্রতিষ্ঠানের জমি উদ্ধার করে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো গেলে শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে না কেন? শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলের দাবি, জমি উদ্ধারের পাশাপাশি সম্পত্তির আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ, বকেয়া ভাড়া নিরূপণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। প্রয়োজনে তাঁরা আন্দোলন-সংগ্রামে যাওয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন, উদ্ধার হবে কবে? ১৯৭৫ সালের চুক্তির ভিত্তিতে শুরু হওয়া জমি ব্যবহারের বিষয়টি পাঁচ দশক পরও বিতর্কের কেন্দ্রে। জমির মালিকানা, চুক্তির মেয়াদ ও শর্ত, পরবর্তী হাতবদলের বৈধতা, বকেয়া ভাড়া এবং বর্তমান দখলের প্রকৃতি সবকিছু নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি রক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ভূমি ও শিক্ষা প্রশাসনের নথি যাচাই, বৈধ দখল ও অবৈধ দখল পৃথক করা, প্রাপ্য ভাড়া নির্ধারণ এবং আইনানুগ প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি হতে পারে। স্থানীয় সচেতন মহলের প্রত্যাশা, অভিযোগ অনুযোগের মধ্যে বিষয়টি আটকে না রেখে দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কারণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পদ রক্ষা শুধু জমি উদ্ধারের প্রশ্ন নয়—এটি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ, শিক্ষার পরিবেশ এবং জনস্বার্থের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

