স্টাফ রিপোর্টার
বিদ্যুৎ চুরি রুখতে মৌলভীবাজারে পল্লী বিদ্যুতের বিশেষ তৎপরতা
দিনের ব্যস্ততা শেষে যখন শহর-গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে পড়েন, তখনও বিদ্যুৎ চুরি ও অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে মাঠে থাকার কথা জানিয়েছে মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে সদর দপ্তর, জোনাল ও সাব-জোনাল অফিসের সমন্বয়ে প্রতিরাতে পরিচালিত হচ্ছে বিশেষ রাত্রিকালীন অভিযান। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ, মিটারে কারচুপি শনাক্ত এবং বিদ্যুৎ চুরি প্রতিরোধই এ অভিযানের মূল লক্ষ্য। তবে অভিযান পরিচালনা করাই শেষ কথা নয় অভিযানের ফলাফল কী, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কতটি এলাকায় অভিযান পরিচালিত
হয়েছে? কতটি অবৈধ সংযোগ শনাক্ত ও বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে? কতটি মিটারে কারচুপি ধরা পড়েছে? কতজনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? এসব অভিযানে মোট কত টাকার বিদ্যুৎ চুরি বা রাজস্ব ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে? অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিদ্যুৎ চুরি কমেছে কি না তার কোনো পরিমাপ বা মূল্যায়ন করা হচ্ছে কি? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো অভিযানে বিচ্ছিন্ন করা সংযোগগুলোর কতগুলো আবার অবৈধভাবে চালু হয়েছে? পুনরায় অবৈধ সংযোগ স্থাপন ঠেকাতে কী ধরনের নজরদারি রাখা হচ্ছে? একই এলাকায় বারবার অবৈধ সংযোগ পাওয়া গেলে এর কারণ কী এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? বিদ্যুৎ চুরি বন্ধে নিয়মিত অভিযান নিঃসন্দেহে প্রয়োজন। কিন্তু জনস্বার্থে সেই অভিযানের পরিসংখ্যান, অগ্রগতি ও ফলাফলও স্বচ্ছভাবে জানানো প্রয়োজন। কারণ শুধু অভিযান পরিচালনার দাবি নয়, জনগণ জানতে চায় অভিযানে বাস্তবে কী পরিবর্তন এসেছে। প্রশ্ন আরও আছে কোনো এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ সংযোগ চললে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসে না কেন? মিটারে কারচুপি হলে সেটি শনাক্ত করার নিয়মিত ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর দায়িত্বাধীন এলাকায় দীর্ঘদিন অনিয়ম চললে তার প্রশাসনিক জবাবদিহির ব্যবস্থা কী সেটিও জনস্বার্থে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। বিদ্যুৎ চুরির প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বিভাগের রাজস্ব ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অবৈধ সংযোগ বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং এর প্রভাবে লো-ভোল্টেজসহ বিভিন্ন ভোগান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। নিয়ম মেনে বিল পরিশোধ করা বৈধ গ্রাহকদের তাই অনিয়মের দায় বহন করতে হওয়া উচিত নয়। অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ হুকিং বা অননুমোদিত বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে শর্টসার্কিট, অগ্নিকাণ্ড, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণহানি কিংবা সম্পদের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে বিদ্যুৎ চুরি শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়; এটি জননিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। এ কারণে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির দায়িত্ব শুধু অভিযান পরিচালনা ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোথায় অনিয়ম হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছে, কারা করছে, কেন দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারছে এবং ব্যবস্থা নেওয়ার পর তা পুনরায় ঘটছে কি না এসব বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি, তথ্য সংরক্ষণ এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে গ্রাহকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। বৈধ সংযোগ ব্যবহার, নিয়মিত বিল পরিশোধ এবং কোথাও অবৈধ সংযোগ বা বিদ্যুৎ চুরির তথ্য থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো নাগরিক দায়িত্বের অংশ। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তথ্য প্রদানকারীর পরিচয় গোপন রাখা হবে। সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায় রাতের এই বিশেষ অভিযান কতটা সফল? কত দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ চুরি কমেছে? কতটি অবৈধ সংযোগ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে? কতজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? এবং বৈধ গ্রাহকরা এর সুফল কতটা পাচ্ছেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে রাত্রিকালীন অভিযান কেবল নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ, নাকি বিদ্যুৎ চুরি প্রতিরোধে বাস্তব ও পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন আনছে। জাতীয় সম্পদ রক্ষায় অভিযান প্রয়োজন; কিন্তু অভিযানের পাশাপাশি প্রয়োজন ফলাফল প্রকাশ, নিয়মিত নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং দৃশ্যমান জবাবদিহি। জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কার্যক্রমের শেষ হিসাবটিও তাই জনগণের কাছেই পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন।

